নম হে নম
সে অনেক বছর আগের কথা। আমি তখন ক্লাস টু তে পড়ি। সেই সময় টাইফয়েডে আক্রান্ত হই। প্যারা টাইফয়েড নয়, একেবারে আসল টাইফয়েড। অদ্ভুত ভাবে অসুখের প্রথম দিকে দিল্লির সেই সময়ের প্রবাদ প্রতিম ডাক্তাররা - ডা. টি. এন. ঘোষ, ডা. এল. এম. গাঙ্গুলি - এরা রোগটা ধরতেই পারলেন না। অসুখ বেড়ে গিয়ে মর মর অবস্থা। অবশেষে রোগ ধরলেন আমার দাদুরই এক বন্ধু ডাক্তার, যিনি আবার এম বি বি এসও নন। তিনি ছিলেন সেকালের এল এম এফ। তাঁর পরামর্শ মত রক্ত পরীক্ষা করে রোগ ধরা পড়ে। তাঁর নামটা এখন আর মনে নেই। আমি তাঁকে ডাক্তার দাদু বলতাম। তিনি তখন প্র্যাকটিস করা ছেড়ে দিয়েছেন। তাই চিকিৎসার ভার নিলেন না। তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী ডা. টি. এন. ঘোষ চিকিৎসা শুরু করলেন।
ডাক্তার দাদু মাঝে মাঝে আমাকে দেখতে আসতেন ও মাকে আমার ব্যাপারে নানারকম উপদেশ দিতেন। বাবাকে বললেন যে, " ওর স্কুলে গিয়ে জানিয়ে এস যে ও অন্তত দু-আড়াই মাস স্কুলে যেতে পারবে না। কেননা চিকিৎসা দেরিতে শুরু হয়েছে। ওর পুরোপুরি সুস্থ হতে সময় লাগবে। রোগ সারবার পরও অন্তত একমাস লাগবে স্বাস্থ্য ফিরে পেতে। আর এখন পুরোপুরি বেড রেস্টে থাকতে হবে। "
সেতো হল। কিন্তু শুয়ে শুয়ে আমার আর সময় কাটেনা। মাকে বাবাকে অনবরত নালিশ করতে লাগলাম।
আমাদের বাড়ির খুব কাছেই ছিল দিল্লির রামকৃষ্ণ মিশন। বাবা সেখানে মাঝে মধ্যেই যেতেন। আমার ঘ্যান ঘ্যান শুনে বাবা একদিন রামকৃষ্ণ মিশনের বুকস্টল থেকে বাচ্চাদের উপযোগী কিছু বই কিনে এনে আমাকে দিলেন। বললেন, " শুয়ে শুয়ে এই বইগুলো পড়। ভাল লাগবে তোর। "
তার মধ্যে একটা বই ছিল - স্বামী বিবেকানন্দের কথা ও গল্প। এই বইটা আমার কাছে এখনো আছে।
আরেকটা বই ছিল - ছোটদের বিবেকানন্দ। বইটা ছিল এখনকার " দেশ " পত্রিকার আকারের থেকে একটু বড় আকারের । বইটিতে স্বামীজির জীবনী ছিল লেখায় ও ছবিতে। এক পাতায় লেখা আর এক পাতায় ছবি। অসম্ভব ভাল ও উচ্চমানের ছিল বইটি। যেমন লেখা তেমন সব ছবি। স্বামীজি ছোটবেলায় দুষ্টুমি করছেন, পরিব্রাজক স্বামীজি, আমেরিকা যাত্রা, বিশ্ববিজয় করা, তাঁর শেষ জীবন। আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা এই ছবিগুলো পাতা উল্টে উল্টে দেখতাম। জানিনা এখনো এই বইটি পাওয়া যায় কিনা। তবে আমি নিঃসন্দেহ যে বাংলা পড়তে পারে এমন কোন পাঁচ ছ বছরের শিশুকে এই বইটি দিলে সে স্বামীজির পাল্লায় পড়বেই পড়বে। যেমন আমি পড়েছিলাম।
তারপর আরো বারোটাটি বাজল যখন ক্লাস এইটে পড়লাম বিখ্যাত লেখক অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের বীরেশ্বর বিবেকানন্দ। সেই যে স্বামীজি নামক মহাসমুদ্রে সাঁতার দেওয়া শুরু হল তা আজও চলছে। চলবেও আজীবন।
মাঝে মাঝে ভাবি, কি অদ্ভুত মানুষ ছিলেন। বেঁচে তো ছিলেন মাত্র উনচল্লিশ বছর কয়েক মাস। তার মধ্যে এত কিছু করে গেলেন কি করে? কি করে সৃষ্টি করলেন অসংখ্য কর্মযোগী? তার অনুপ্রেরণায় সৃষ্টি হলেন সুভাষের মত বিপ্লবী। তাঁর ব্রহ্মলীন হবার পর এত বছর পেরিয়ে গেলেও এখনও কত শত মানুষ তাঁর অনুপ্রেরণায় ও তাঁকে গুরু মনে করে নিজের জীবন উৎসর্গ করে দেয় - কখনো বা পরহিতার্থে আবার কখনো বা দেশ মাতৃকার পদতলে।
এরকম মানুষদের কথা আমাদের কানে আসেনা কেননা তাঁরা নিজেদের নাম যশের জন্য কিছু করেন না। তাঁরা সবাই সন্ন্যাসীও নন। কিন্তু তাঁরা নিজেদের কাজটা ঠিকই করে যান।
এই রকম কিছু মানুষের সন্ধান আছে আমার কাছে। তাদের নিয়ে ভবিষ্যতে লেখার ইচ্ছা রইল।
জয়তু বিবেকানন্দ।

No comments:
Post a Comment