Tuesday, February 15, 2022

দেবী সরস্বতীর কথা

 দেবী সরস্বতীর কথা


দেবী সরস্বতী হলেন হিন্দুধর্মে জ্ঞান, সংগীত, শিল্পকলা, বাক্য, প্রজ্ঞা ও বিদ্যার্জনের দেবী। সরস্বতী, লক্ষ্মী ও পার্বতী হিন্দুধর্মে ‘ত্রিদেবী’ নামে পরিচিত।


দেবীর আবাস হল সত্যলোক, মণিদ্বীপ। 

আর মন্ত্র হল- ওঁ ঐঁ সরস্বত্যৈ নমঃ। দেবীর প্রতীকসমূহ হল সাদা রং, পদ্ম, বীণা, সরস্বতী নদী, পুস্তক। দেবীর বাহন হল রাজহংস বা ময়ূর


দেবী রূপে সরস্বতীর প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় ঋগ্বেদে।  বৈদিক যুগ থেকে শুরু করে আধুনিক যুগ পর্যন্ত হিন্দুধর্মে তিনি একজন গুরুত্বপূর্ণ দেবীর স্থান অধিকার করে রয়েছেন। সরস্বতী সাধারণত দ্বিভূজা বা চতুর্ভূজা মূর্তিতে পূজিতা হন। দ্বিভূজা মূর্তিতে তাঁর হাতে থাকে বীণা ও পুস্তক। চতুর্ভূজা মূর্তিতে থাকে পুস্তক, অক্ষমালা, কলস ও বীণা। হিন্দুধর্মে এই প্রত্যেকটি বস্তুরই প্রতীকী অর্থ রয়েছে।


হিন্দুদের একাংশ সরস্বতীর পূজা করেন শ্রীপঞ্চমী বা বসন্তপঞ্চমীর (মাঘ মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথি, এই দিনটি ভারতের বিভিন্ন অংশে সরস্বতী পূজা বা সরস্বতী জয়ন্তী নামেও পরিচিত) দিন। এই দিনটিতে শিশুদের হাতেখড়ি অনুষ্ঠানের (প্রথম অক্ষর শিক্ষার অনুষ্ঠান) আয়োজন করা হয়। পশ্চিম ও মধ্য ভারতে জৈন ধর্মাবলম্বীরাও সরস্বতীর পূজা করেন। এছাড়া বৌদ্ধদের কোনও কোনও সম্প্রদায়েও সরস্বতী পূজা প্রচলিত।


সরস ও বতী – এই দুই সংস্কৃত শব্দের সন্ধির মাধ্যমে সরস্বতী নামটির উৎপত্তি। সরস শব্দের আক্ষরিক অর্থ হ্রদ বা সরোবর হলেও এটির অপর অর্থ "বাক্য"। বতী শব্দের অর্থ "যিনি অধিষ্ঠাত্রী"। নামটি আদিতে "সরস্বতী" নামে পরিচিত এক বা একাধিক নদীর সঙ্গে যুক্ত হলেও এই নামটির আক্ষরিক অর্থ তাই হয় "যে দেবী পুষ্করিণী, হ্রদ ও সরোবরের অধিকারিণী" বা ক্ষেত্রবিশেষে "যে দেবী বাক্যের অধিকারিণী"। সংস্কৃত ব্যাকরণ অনুযায়ী "সরস্বতী" শব্দটির সন্ধিবিচ্ছেদ এভাবেও হতে পারে - সরসু+অতি। সেক্ষেত্রে শব্দটির অর্থ দাঁড়ায় "যা প্রচুর জল ধারণ করে"।


ঋগ্বেদে নদী ও গুরুত্বপূর্ণ এক দেবী উভয় অর্থেই "সরস্বতী" নামটি পাওয়া যায়। প্রাথমিক পংক্তিগুলিতে শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে সরস্বতী নদী অর্থে এবং দৃশদ্বতী সহ বিভিন্ন উত্তরপশ্চিম ভারতীয় নদীর নামের সঙ্গে একই সারিতে। তারপর সরস্বতীকে এক নদী দেবতা হিসেবে উপস্থাপনা করা হয়েছে। ঋগ্বেদের দ্বিতীয় মণ্ডলে সরস্বতীকে শ্রেষ্ঠ মাতা, শ্রেষ্ঠ নদী ও শ্রেষ্ঠ দেবী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।


অম্বিতমে নদীতমে দেবিতমে সরস্বতি

— ঋগ্বেদ ২.৪১.১৬ 


সরস্বতী হলেন মাতৃকাগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, নদীগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ এবং দেবীগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ।


ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলে সরস্বতীকে প্রচুর প্রবহমান জলের আরোগ্যদাত্রী ও পাবনী শক্তির দেবী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে:

অপো অস্মান মাতরঃ শুন্ধয়ন্তু ঘর্তেন নো ঘর্তপ্বঃ পুনন্তু।

 বিশ্বং হি রিপ্রং পরবহন্তি দেবিরুদিদাভ্যঃ শুচিরাপুত এমি।। 

— ঋগ্বেদ ১০.১৭


অর্থাত


মাতৃস্বরূপা জলসমূহ আমাদের পরিশুদ্ধ করুন,

যাঁরা ননীর দ্বারা শোধিত হয়েছে, তাঁরা আমাদের ননীর দ্বারা পরিশুদ্ধ করুন।

কারণ এই দেবীগণ কলুষ দূর করেন,

আমি এদের থেকে উঠে আসি পবিত্র ও পরিশুদ্ধ হয়ে।


বৈদিক সাহিত্যে সরস্বতী প্রাচীন ভারতীয়দের কাছে সেই গুরুত্ব বহন করত (জন মুয়্যারের মত অনুযায়ী), যে গুরুত্ব তাদের আধুনিক উত্তরসূরিদের কাছে গঙ্গা নদী বহন করে। ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলেই সরস্বতীকে "জ্ঞানের অধিকারিণী" বলে ঘোষণা করা হয়েছে। ঋগ্বেদের পরবর্তী যুগে রচিত বেদগুলিতে (বিশেষত ব্রাহ্মণ অংশে) সরস্বতীর গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পায়। এই গ্রন্থগুলিতেই শব্দটির অর্থ "পবিত্রতা দানকারী জল" থেকে "যা পবিত্র করে", "যে বাক্য পবিত্রতা দান করে", "যে জ্ঞান পবিত্রতা দান করে" অর্থে পরিবর্তিত হয় এবং শেষ পর্যন্ত তা এমন এক দেবীর আধ্যাত্মিক ধারণার রূপ গ্রহণ করে যিনি জ্ঞান, শিল্পকলা, সংগীত, সুর, কাব্য-প্রতিভা, ভাষা, অলংকার, বাগ্মীতা, সৃজনশীল কর্ম এবং যা কিছু একজন মানুষের অন্তঃস্থল বা আত্মাকে পবিত্রতা দান করে তার প্রতিভূ হয়ে হঠেন।


 উপনিষদ্‌ ও ধর্মশাস্ত্রগুলিতে সরস্বতীকে আবাহন করা হয়েছে পাঠককে সদ্গুণের ধ্যান, পবিত্রতার ফল, ব্যক্তির কর্মের অর্থ ও সারকথা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য।


প্রাচীন হিন্দু সাহিত্যে সরস্বতী নানা নামে পরিচিত। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যায় ব্রহ্মাণী (ব্রহ্মার শক্তি), ব্রাহ্মী (বিজ্ঞানের দেবী),  ভারতী (ইতিহাসের দেবী), বর্ণেশ্বরী (অক্ষরের দেবী), কবিজিহ্বাগ্রবাসিনী (যিনি কবিগণের জিহ্বাগ্রে বাস করেন) ইত্যাদি। 


আবার সরস্বতী, বিদ্যাদাত্রী, বীণাবাদিনী, পুস্তকধারিণী, বীণাপাণি, হহংসবাহিনী  ও বাগদেবী নামেও পরিচিতা।


অগদ ব্যাখ্যা অনুযায়ী, "সর" শব্দের অর্থ "সার" বা "নির্যাস" এবং "স্ব" শব্দের অর্থ "আত্ম"। এই অর্থ ধরলে "সরস্বতী" নামটির অর্থ দাঁড়ায় "যিনি আত্মার সার উপলব্ধি করতে সহায়তা করেন" অথবা "যিনি (পরব্রহ্মের) সার ব্যক্তির আত্মার সঙ্গে মিলিত করেন"।


 হিন্দি ভাষায় এই দেবীর নামের বানান হল: सरस्वती। তেলুগু ভাষায় দেবী সরস্বতী পরিচিত চদুবুলা তাল্লি (చదువుల తల్లి) বা শারদা (శారద) নামে। কোঙ্কণি ভাষায় সরস্বতীকে বলা হয় শারদা, বীণাপাণি, পুস্তকধারিণী ও বিদ্যাদায়িণী। কন্নড় ভাষায় সরস্বতীর যে নামান্তরগুলি প্রচলিত তার মধ্যে বিখ্যাত শৃঙ্গেরী মন্দিরে দেখা যায় শারদে, শারদাম্বা, বাণী ও বীণাপাণি নামগুলি। তামিল ভাষায় সরস্বতী পরিচিত কলৈমগল, নামগল, কলৈবাণী, বাণী ও ভারতী নামে। কুরল সাহিত্যের মাহাত্ম্যব্যঞ্জক পঞ্চান্নটি তামিল শ্লোকের সংকলন তিরুভাল্লুবর মালই গ্রন্থে এবং গ্রন্থকার ভাল্লুবর কর্তৃক সরস্বতী নামগল নামে বন্দিত হয়েছেন এবং কথিত আছে এই সংকলনের দ্বিতীয় শ্লোকটি স্বয়ং সরস্বতীর রচনা।


সরস্বতী বানানটি অসমীয়া ভাষায় সৰস্বতী, মালয়ালম ভাষায় സരസ്വതി, তামিল ভাষায় சரஸ்வதி, ও ওড়িয়া ভাষায় ସରସ୍ଵତୀ। 


ভারতীয় উপমহাদেশের বাইরে বর্মি ভাষায় সরস্বতী পরিচিত থুরাথাডি (သူရဿတီ, উচ্চারিত: [θùja̰ðədì] বা [θùɹa̰ðədì]) বা তিপিটক মেডাউ নামে, চীনা ভাষায় পরিচিত Biàncáitiān (辯才天) নামে, জাপানি ভাষায় পরিচিত বেনজাইতেন (弁才天/弁財天) নামে এবং থাই ভাষায় পরিচিত সুরতসওয়াদি (สุรัสวดี) বা সরতসওয়াদি (สรัสวดี) নামে।


ধ্যানমন্ত্রে বর্ণিত প্রতিমা কল্পটিতে দেবী সরস্বতীকে শ্বেতবর্ণা, শ্বেতপদ্মে আসীনা, মুক্তার হারে ভূষিতা, পদ্মলোচনা ও বীণাপুস্তকধারিণী এক দিব্য নারীমূর্তিরূপে কল্পনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে,


ওঁ তরুণশকলমিন্দোর্বিভ্রতী শুভ্রকান্তিঃ কুচভরনমিতাঙ্গী সন্নিষণ্ণা সিতাব্জে।

নিজকরকমলোদ্যল্লেখনীপুস্তকশ্রীঃ সকলবিভবসিদ্ধ্যৈ পাতু বাগ্দেবতা নঃ।।


অর্থাৎ, “চন্দ্রের নূতন কলাধারিণী, শুভ্রকান্তি, কুচভরনমিতাঙ্গী, শ্বেতপদ্মাসনে (উত্তমরূপে) আসীনা, হস্তে ধৃত লেখনী ও পুস্তকের দ্বারা শোভিত বাগ্‌দেবী সকল বিভবপ্রাপ্তির জন্য আমাদিগকে রক্ষা করুন।”


আবার পদ্মপুরাণ-এ উল্লিখিত সরস্বতীস্তোত্রম্-এ বর্ণিত হয়েছে,


শ্বেতপদ্মাসনা দেবী শ্বেতপুষ্পোপশোভিতা।

শ্বেতাম্বরধরা নিত্যা শ্বেতগন্ধানুলেপনা॥১

শ্বেতাক্ষসূত্রহস্তা চ শ্বেতচন্দনচর্চিতা।

শ্বেতবীণাধরা শুভ্রা শ্বেতালঙ্কারভূষিতা॥২

ইত্যাদি


অর্থাৎ, “দেবী সরস্বতী আদ্যন্তবিহীনা, শ্বেতপদ্মে আসীনা, শ্বেতপুষ্পে শোভিতা, শ্বেতবস্ত্র-পরিহিতা এবং শ্বেতগন্ধে অনুলিপ্তা॥১॥ 

অধিকন্তু তাঁহার হস্তে শ্বেত রুদ্রাক্ষের মালা; তিনি শ্বেতচন্দনে চর্চিতা, শ্বেতবীণাধারিণী, শুভ্রবর্ণা এবং শ্বেত অলঙ্কারে ভূষিতা॥২॥”


ধ্যান বা স্তোত্রবন্দনায় উল্লেখ না থাকলেও সরস্বতী দেবী ক্ষেত্রভেদে দ্বিভুজা অথবা চতুর্ভুজা এবং হংসবাহনা অথবা ময়ূরবাহনা রূপে পূজিতা হন। উত্তর ও দক্ষিণ ভারতে সাধারণত ময়ূরবাহনা চতুর্ভুজা সরস্বতী প্রতিমার পূজা করা হয়। ইনি অক্ষমালা, কমণ্ডলু, বীণা ও বেদপুস্তকধারিণী। বাংলা তথা পূর্বভারতে সরস্বতী দ্বিভুজা ও রাজহংসের পৃষ্ঠে আসীনা।


বঙ্গে শ্রীশ্রী সরস্বতী পুষ্পাঞ্জলি-মন্ত্রঃ


ওঁ জয় জয় দেবি চরাচরসারে, কুচযুগশোভিতমুক্তাহারে। 

বীণারঞ্জিতপুস্তকহস্তে, 

ভগবতি ভারতি দেবি নমস্তে॥ 

ভদ্রকাল্যৈ নমো নিত্যং সরস্বত্যৈ নমো নমঃ। বেদ-বেদাঙ্গ-বেদান্ত-বিদ্যা-স্থানেভ্য এব চ॥ 

এষ সচন্দনপুষ্পবিল্বপত্রাঞ্জলিঃ ঐং সরস্বত্যৈ নমঃ॥


প্রণাম-মন্ত্রঃ


 সরস্বতি মহাভাগে বিদ্যে কমললোচনে। 

বিশ্বরূপে বিশালাক্ষি বিদ্যাং দেহি নমোঽস্তু তে॥


সরস্বতীর স্তবঃ 


শ্বেতপদ্মাসনা দেবী শ্বেতপুষ্পোপশোভিতা। শ্বেতাম্বরধরা নিত্যা শ্বেতাগন্ধানুলেপনা॥ শ্বেতাক্ষসূত্রহস্তা চ শ্বেতচন্দনচর্চ্চিতা। 

শ্বেতবীণাধরা শুভ্রা শ্বেতালঙ্কারভূষিতা॥

 বন্দিতা সিদ্ধগন্ধর্ব্বৈরর্চ্চিতা দেবদানবৈঃ। 

পূজিতা মুনিভিঃ সর্ব্বৈর্ ঋষিভিঃ স্তূয়তে সদা॥ স্তোত্রেণানেন তাং দেবীং জগদ্ধাত্রীং সরস্বতীম্।

 যে স্মরন্তি ত্রিসন্ধ্যায়াং সর্ব্বাং বিদ্যাং লভন্তি তে॥


স্কন্দপুরাণে এই কাহিনী পাওয়া যায়। জগতে সকল দেবতার তীর্থ আছে, শুধু ব্রহ্মার তীর্থ নেই – একথা ভেবে ব্রহ্মা পৃথিবীতে নিজের তীর্থ স্থাপনে উদ্যোগী হলেন। তিনি একটি সর্বরত্নময়ী শিলা পৃথিবীতে নিক্ষেপ করলেন। সেটি চমৎকারপুরে এসে পড়ল। ব্রহ্মা সেখানেই নিজের তীর্থ স্থাপন করবেন বলে ভাবলেন। ব্রহ্মার নির্দেশে তার স্ত্রী সরস্বতী পাতাল থেকে উঠে এলেন। ব্রহ্মা তাকে বললেন, “তুমি এখানে আমার কাছে সব সময় থাকো। আমি তোমার জলে ত্রিসন্ধ্যা তর্পণ করব।” সরস্বতী ভয় পেয়ে বললেন, “আমি লোকের স্পর্শে ভয় পাই বলে সব সময় পাতালে থাকি। কিন্তু আপনার আদেশ আমি অমান্যও করতে পারি না। আপনি সব দিক বিচার করে একটি ব্যবস্থা করুন।”  তখন ব্রহ্মা সরস্বতীর অবস্থানের জন্য একটি হ্রদ খনন করলেন। সরস্বতী সেই হ্রদে অবস্থান করতে লাগলেন। ব্রহ্মা ভয়ংকর সাপেদের সেই হ্রদ ও সরস্বতীর রক্ষক নিযুক্ত করলেন।


আবার দেবী ভাগবত পুরাণ অনুসারে, দেবী সরস্বতীর জন্ম বিষ্ণুর জিহ্বাগ্র থেকে। সরস্বতী বাক্য, বুদ্ধি, বিদ্যা ও জ্ঞানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী।  সকল সংশয় ছেদকারিণী ও সর্ব সিদ্ধি প্রদায়িনী এবং বিশ্বের উপজীবিকা স্বরূপিনী। ব্রহ্মা প্রথমে তাঁকে পূজা করেন। পরে জগতে তাঁর পূজা প্রতিষ্ঠিত হয়। সরস্বতী শুক্লবর্ণা, পীতবস্ত্রধারিণী এবং বীণা ও পুস্তকহস্তা। তিনি নারায়ণ এর থেকে সৃষ্ট হন তাই তিনি তাঁকে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করেন। পরে তিনি গঙ্গার দ্বারা অভিশাপ পান ও তিনি এক অংশে পুনরায় শিবের চতুর্থ মুখ থেকে সৃষ্ট হন ও ব্রহ্মা কে পতি রূপে গ্রহণ করেন। তারপর কৃষ্ণ জগতে তাঁর পূজা প্রবর্তন করেন। মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের পঞ্চমী তিথিতে তাঁর পূজা হয়।


আবার অন্য এক কাহিনী অনুসারে, গঙ্গা, লক্ষ্মী ও আসাবারী (সরস্বতীর পূর্ব জন্মের নাম) ছিলেন নারায়ণের তিন পত্নী। একবার গঙ্গা ও নারায়ণ পরস্পরের দিকে তাকিয়ে হাসলে তিন দেবীর মধ্যে তুমুল বিবাদ উপস্থিত হয়। এই বিবাদের পরিণামে একে অপরকে অভিশাপ দেন। গঙ্গার অভিশাপে আসবারী নদীতে পরিণত হন। পরে নারায়ণ বিধান দেন যে, তিনি এক অংশে নদী, এক অংশে ব্রহ্মার পত্নী ও শিবের কন্যা হবেন এবং কলিযুগের পাঁচ হাজার বছর অতিক্রান্ত হলে সরস্বতী সহ তিন দেবীরই শাপমোচন হবে।


গঙ্গার অভিশাপে আসাবারীমর্ত্যে নদী হলেন এবং ব্রহ্মার পত্নী হলেন ও শিবের চতুর্থ মুখ থেকে সৃষ্টি হয়ে তার কন্যা হলেন।


শুক্ল যজুর্বেদ  অনুসারে, রামায়ণ রচয়িতা বাল্মীকি যখন ক্রৌঞ্চ হননের শোকে বিহ্বল হয়ে পড়েছিলেন, সে সময় জ্যোতির্ময়ী ব্রহ্মাপ্রিয়া সরস্বতী তাঁর ললাটে বিদ্যুৎ রেখার মত প্রকাশিত হয়েছিলেন। 


সব শেষে দেখা যাক দেবী সরস্বতীর ১০৮ টি নাম বা অষ্টোত্তর শতনাম কিঃ


সর্বোত্তম নাম তার দেবী সরস্বতী।১

দেবগণ কৃত নাম হয় যে ভারতীয়।। ২

বেদকত্রী হয়ে দেবী হন বেদমাতা।৩ 

গীৰ্ব্বাণী নামে তিনি জগৎ বিখ্যাত 4

 বাগদেবী হলেন তিনি বাক্য সৃষ্টি করি।৫ 

শ্বেতাম্বরধরা নাম শ্বেত বস্ত্র পরি ।।৬

বাক্যের স্বরূপ বলে বাণী নাম তার।৭

করেন অক্ষরা নামে জগৎ উদ্ধার॥৮ 

পদ্মাসনা নাম হল পদ্ম পরী বসি।৯

মুক্তি প্রদায়িনী বলে মােক্ষদা প্রবাসী ।।১০'

শ্বেতবীণা করে তাই শ্বেতবীণাধরা।১১ 

শ্বেতপদ্ম ধরি হন শ্বেতপদ্মকরা।১২

জগত তারণ হেতু জগদ্ধাত্রী নাম।১৩ 

ক্ষেমঙ্করী নামে হয় পূর্ণ মনস্কাম।১৪ 

অক্ষসূত্র করে তাই অক্ষসূত্রকরা।১৫ 

শুভঙ্করী নামে দেবী পালেন এ ধারা ১৬ 

কোন বিদ্যা নাহি হয় কৃপা বিনা তাঁর।

বিদ্যা-অধিষ্ঠাত্রী নামটি তাহার ১৭ 

পাপনাশ করি হন দূরিত-নাশিনী।১৮ 

গন্ধৰ্ব্বেরা পূজে তারে বলি বীণাপাণি ১৯ 

সনকাদি ঋষিগণে বলে সনাতনী।২০

আদ্যাশক্তি ব’লে দেবী হন পুরাতনী। 

মহেশ্বরী নাম তার মহেশ্বর-পুরে।২১

সাবিত্রী তাহার নাম হয় ব্রহ্মপুরে॥২২ 

বৈষ্ণবী নামেতে তিনি বিষ্ণুপুরে খ্যাত।২৩ 

ত্রৈলােক্য-জননী নামে সর্বত্র বিদিত ২৪ 

সর্বমন্ত্রময়ী নাম সামাদি বেদেতে।২৫

বিভাবরী নাম তার বিদিত জগতে ২৬ 

তুষ্টি নাম হ’ল করি সন্তোষ বিধান।২৭ 

পুষ্টি নাম হ’ল তার করি পুষ্টি ধান ২৮

ক্রোধ রূপা তিনি হন শত্রুর মন্দিরে।২৯ 

ধনেশ্বরী নাম তার কুবের-আগারে।৩০ 

ত্রিপুরা তাহার নাম বিখ্যাত ভুবনে।৩১ 

তপস্বিনী নাম তার মুনি তপোবনে।৩২ 

কুমারী তাহার নাম গৃহস্থের ঘরে॥৩৩ 

মহাভয়ঙ্করী নাম হয় দৈত্যপুরে।৩৪ 

ভক্তিবশ্যা নাম তার ভক্তের ভবনে।৩৫ 

উগ্রচণ্ডা নামে খ্যাত এ তিন ভুবনে।৩৬

 বীরমাতা নামে খ্যাত হন ক্ষত্রকুলে।৩৭ 

বিজয়িনী নাম তার হয় রণস্থলে।৩৮ 

কুলাচাররত স্থানে শ্রীকুলসুন্দরী।৩৯

ত্রিভুবন মধ্যে দেবী শ্রী ভুবনেশ্বরী॥৪০

 সিদ্ধিদাত্রী নাম তার সিদ্ধি দান করে।৪১

খেচরী নামেতে খ্যাত গগন মাঝারে৪২

 বুদ্ধিদান করি দেবী হলেন বুদ্ধিদা।৪৩

 বিতরণ করে জ্ঞান হলেন জ্ঞানদা॥৪৪

 যােগিনীগণেরা ডাকে বলিয়া যােগিনী।৪৫

জ্ঞানীরা সকলে ভজে বলি মনস্বিনী।৪৬

মঙ্গলা নামেতে দেবী মঙ্গলদায়িনী।৪৭

বহ্নিতে তিনিই পুনঃ জ্বালিনীরূপিণী॥৪৮

গুণের অতীত বলে নাম যে নির্গুণ।৪৯

সৰ্ব্বগুণযুতা তাই নাম যে সণ্ডণা॥৫০

ক্লেশ নাশ করি দেবী ক্লেশ-বিনাশিনী।৫১

সুদক্ষ মন্ত্রণা দানে নাম যে মন্ত্রী॥৫২

আনন্দে সদাই মগ্ন সদানন্দময়ী।৫৩

বলিপ্রিয়া নামে তিনি সদা কৃপাময়ী॥৫৪

মন্দাকিনী নামে তিনি সাগরবাসিনী।৫৫

জয়দা নামেতে দেবী বিজয়দায়িনী।৫৬

বসুমতি রূপে তিনি পৃথিবীরূপিণী।৫৭

শ্মশানে তিনিই দেবী শ্মশানবাসিনী ৫৮

পার্বতী তিনিই দেবী তিনি শ্বেতবর্ণা।৫৯

বারাণসী-ধামে তিনি দেবী-অন্নপূর্ণা॥৬০

গুহ্যবিদ্যা খ্যাত তার বিদ্যার মাঝারে।৬১

পাৰ্ব্বর্তী তাহার নাম নগেন্দ্র-মন্দিরে।৬২

 ক্ষমাণ্ডণে বিভূষিতা তাই ক্ষমাবতী।৬৩

পাতালে নাগিনী নামে তাহার বসতি।৬৪

 দশভূজা নামে তিনি শ্রীদুর্গারমণী।৬৫

অষ্টাদশভূজা রূপে দুঃখ বিনাশিনী॥৬৬

গঙ্গা নামে জল রূপে বসতি ধরায়।৬৭

স্বর্গ ধাম মন্দাকিনী তাহাকেই কয় ৬৮

ভােগবতী নাম তার পাতাল-ভুবনে।৬৯

সতী নাম হয় তার মহেশ-ভবনে।৭০

অচিন্তা তাহার নাম চিন্তা বিনাশিয়া।৭১

সুমতি তাহার নাম বুদ্ধি ভিতরিয়া॥৭২

 পুণ্যের আধার তাই নাম পুণ্যালয়া।৭৩

পীনােন্নতত্তনী স্তন উন্নত বলিয়া॥৭৪

করেতে লেখনি ধরি লেখনি-ধারিণী।৭৫

হাসিমুখ সদা তাই নাম স্মেরাননী॥৭৬

মহামায়া নামে তিনি মায়ার আধার।৭৭

গজেন্দ্র গমনা তাই ধীর গতি তার।৭৮

মধুর বচন তাই মধুর ভাষিণী।৭৯

নারায়ণ বামে তিনি হন নারায়ণী॥৮০

চন্ড মুন্ড বধে দেবী চামুণ্ডারূপিণী।৮১

প্রচণ্ডা রূপেতে তিনি দানব-ঘাতিনী ৮২

মেঘের বরণে নব নীল ঘনশ্যামা।৮৩

নীল সরস্বতী রূপে তিনি যে মা উমা॥৮৪

জীবের দুর্গতি নাশি দুর্গতি-হারিণী।৮৫

কামরূপ তিনি হন কামাক্ষ্যা বাসিনী॥৮৬

ময়ূর-বাহন তিনি সাজেন কৌমারী।৮৭

মুক্তকেশী নাম তার কেশ মুক্ত করে॥৮৮

অট্টহাসি বলে তারে হেরি উচ্চ হাস৷৮৯

পূণ্যশ্লোকা নামে তিনি জগতে প্রকাশ॥৯০

সুন্দর নিয়ম তার তাইত সুনীতি।৯১ 

কৈবল্যদায়িনী নাম দিয়ে মুক্তি।। ৯২

 পরম ঈশ্বরী তিনি বিদিত ভুবনে।৯৩

গীতিপ্রিয়া নামে খ্যাত সঙ্গীত-ভবনে ৯৪

 বামদেবী নাম তার জানে সর্বজন।৯৫

তরুণী নামেতে পূজে যত ভক্ত জন ৯৬

ক্ষোভকরি ক্ষোভহরি তিনি সরস্বতী।৯৭

ঐশ্বর্যশালী তাই নাম ভূতিমতী ৯৮

মন্দ মন্দ হাসি তাই নাম মন্দ হাসা।৯৯

 সত্যবতী নাম তার তিনি সৰ্বভাষা ১০০

সিংহ হারি চড়ি দেবী শ্রীসিংহবাহিনী।১০১

 থাকিয়া কমলবনে কমলবাসিনী॥১০২

 তারাগণ মধ্যে তাঁর নাম অরুন্ধতী।১০৩

শবাসনা নামে তার সর্বোপরি স্থিতি ১০৪

গৌরী নামে বিভাষিত সৰ্ব্বত্র বিভূতি।১০৫

শিবকে করিয়া দূত নাম শিবদূতী।১০৬

সুরগণ মধ্যে তিনি দেবী সুরেশ্বরী।১০৭

মােক্ষদাত্রী নামে তিনি জগত-ঈশ্বরী॥১০৮

অষ্টোত্তর শতনাম হল সমাপন।

মন দিয়া কর সবে মাহাত্ম্য শ্রবণ।।

 ভক্তিভাবে যেইজন করিবে শ্রবণ।

অথবা পড়িবে যেই হয়ে এক মন।।

 হইবে সকল সিদ্ধি করগত তার।

কিছু না থাকিবে লােকে অসাধ্য তাহার ।।

বিশেষতঃ পর্বদিনে করিলে পঠন।

চর্তুবর্গ ফল তার হইবে সাধন।

শুক্লপক্ষ পঞ্চমীতে যেই মহাজন।

অষ্টোত্তর শতনাম করিবে গঠন।।

 ধন-জন বিদ্যা-বুদ্ধি তাহার আগারে।

পরিপূর্ণ থাকিবেক সরস্বতী-বই।


মা সরস্বতী আপনাদের সদা কৃপা করুন।


0 Comments:

Post a Comment

Subscribe to Post Comments [Atom]

<< Home