কান্না
( ১)
সকাল সাতটায় দুঃসংবাদ পেয়ে বরাহনগর থেকে চলে এসেছেন নিবেদিতা। বসে আছেন গুরুর শয্যার বাম পার্শ্বে। হাতপাখা দিয়ে হাওয়া করে চলেছেন গুরুকে। মাঝে মাঝে একটা সাদা রুমাল দিয়ে চোখের জল মুছছেন। বুক ফেটে যাচ্ছে তাঁর। ডুকরে কাঁদতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু অন্যদের শোক দেখে নিজের শোককে সংযত করে রেখেছেন নিবেদিতা।
গুরুদেবের নশ্বর শরীরের দিকে তাকাতে ইচ্ছা করছে না নিবেদিতার। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার চোখও ফেরাতে পারছেন না। গুরুদেবকে যে কোনদিন এইভাবে দেখতে হবে তা কখনো ভাবেননি নিবেদিতা।
গুরুদেবের শরীর গৈরিক বসনে সুসজ্জিত। ডান হাতের আঙ্গুলে রুদ্রাক্ষের জপমালা জড়িত আছে। শয্যার দুই পাশে স্থাপিত ধূপদানী হতে উত্থিত ধূপের মধুর সৌরভে ঘরখানি আমোদিত হয়ে আছে।
একটু আগেই এসেছিলেন গুরুদেবের মাতা ভুবনেশ্বরী দেবী নিজের দৌহিত্র ব্রজমোহন ঘোষকে সাথে নিয়ে। এসেছিলেন গুরুদেবের কনিষ্ঠ ভ্রাতা ভূপেন্দ্রনাথ ও গুরুদেবের ভগ্নিপতি। গুরুদেবের অন্য ভ্রাতা মহেন্দ্রনাথ কলকাতার বাইরে। পর্য্যটকরূপে কোথায় তিনি যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন তা কেউ জানেনা।
শোকাতপা ভুবনেশ্বরী দেবীর দিকে তাকাতে পারছিলেন না নিবেদিতা। স্বামীকে তো অনেক আগেই হারিয়েছেন। দশ সন্তানের জননী ভুবনেশ্বরী দেবী এবার হারালেন নিজের সপ্তম সন্তানকে। মাত্রই কিছুদিন পূর্বে হারিয়েছেন ষষ্ঠ সন্তান কন্যা যোগীন্দ্রবালাকে। সুদূর সিমলায় স্বামীগৃহে আত্মহত্যা করেছিলেন যোগীন্দ্রবালা। মাত্র চব্বিশ বছর বয়েস ছিল তার।
ঘরে ঢুকেই নিজের শায়িত পুত্রের মস্তক কোলে তুলে নিয়েছিলেন শোকাতুরা জননী। পুত্রের বুকে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন, " হ্যাঁরে বিলে, উঠে বোস বাবা। দেখ আমি এসেছি। খুব কষ্ট হচ্ছে তোর, না বাবা। একি তোমরা ডাক্তার ডাকছ না কেন। শীগগীর ডাক্তার ডাক। আমি বলছি বিলে ভাল হয়ে যাবে। আমাকে ফেলে, ওর দিদিমাকে ফেলে, ছোট ভাইদের ফেলে ও কি চলে যেতে পারে। ও সেরকম ছেলেই না...."
নিবেদিতার দিকে চোখ পড়তে, কাঁদতে কাঁদতে বললেন, " ওগো, আমার ভাল মেয়ে, তোমাদের সাহেব ডাক্তারদের একবার খবর দাওনা গো। ওরা তো খুব ভাল চিকিৎসা করে শুনেছি। যা টাকা লাগে আমি দেব...যেখান থেকে পারি..."
কিছু বলতে পারলেন না নিবেদিতা। নীরবে শুধু চোখ মুছতে লাগলেন।
এখানে যতক্ষণ থাকবেন শোক সামলাতে পারবেন না। তাই গুরুদেবের গুরুভাইরা ভুবনেশ্বরী দেবীকে যথাসাধ্য সান্ত্বনা দিয়ে বুঝিয়ে কলকাতায় ফেরবার নৌকায় উঠিয়ে দিলেন।
নিবেদিতার হৃদয়ে আনাগোনা করে কত কথা। স্মৃতির দল ভরাক্রান্ত করে তোলে অন্তরকে। অন্যরা তাঁর গুরুদেবকে চেনে জগত বিজয়ী স্বামী বিবেকানন্দ রূপে। কিন্তু নিবেদিতার কাছে তিনি শুধুই গুরুদেব। এত শ্রদ্ধা আর কখনো কাউকে করেন নি নিবেদিতা। গুরুদেবের এক কথায় নিজের দেশ জাতি আত্মীয় পরিজন সব ছেড়ে চলে এসেছিলেন ভারতবর্ষে। গুরুদেবের কথায় নিজের জীবন তিনি উৎসর্গ করেছেন ভারতের জন্য ভারতবাসীদের জন্য। গুরুদেবের এক কথায় নিজের প্রাণ দেবার জন্যও তিনি প্রস্তূত ছিলেন। কত কিছুই না শিখিয়েছেন গুরুদেব। পাল্টে দিয়েছেন নিবেদিতার জীবনের দৃষ্টিভঙ্গি ও দার্শনিকতা। কতবার কত তর্ক হয়েছে গুরুদেবের সাথে নানা বিষয়ে। গুরুদেব ধীর স্থির ভাবে সব বুঝিয়ে দিয়েছেন, " মার্গট, এই বিষয়টা তুমি যা ভাবছ সে রকম নয়। বিষয়টা হল এই রকম.....".
গুরুদেব মার্গট বলে ডাকতেন তাকে। নিবেদিতার ইংরেজি নামের প্রথমাংশ মার্গারেটের থেকে মার্গট।
তাঁর সেই পরম শ্রদ্ধেয় গুরুদেব ব্রহ্মলীন হয়েছেন গতকাল রাত ন'টার কিছু পরে। সেদিন তারিখ ছিল ০৪ জুলাই ১৯০২।
(২)
তিন দিন আগেও নিবেদিতা এসেছিলেন বেলুড়ে। গুরুদেব তাকে যত্ন করে খাওয়ালেন। খাওয়ার পর ঘটি থেকে হাত ধোবার জল ঢেলে দিলেন। হাত ধোবার পর পরিষ্কার গামছা দিয়ে প্রিয় শিষ্যার হাত মুছিয়ে দিতে গেলেন। এবার অপ্রস্তূত হলেন নিবেদিতা। বললেন, " স্বামীজি, এসব তো আমার করার কথা আপনার জন্য। আপনি কেন এসব করছেন। "
এমন সময় গুরুদেবের অক্ষির উপর দৃষ্টিপাত করলেন নিবেদিতা। কি অদ্ভুত দৃষ্টিতে গুরুদেব তাকিয়ে আছেন তার দিকে। তাঁর দুই উজ্জ্বল যোগীচক্ষুর দুই মণিতে যেন তারার জ্যোতি প্রদীপ্ত হয়েছে। কি শান্ত, কি স্নিগ্ধ ভাব।
গুরুদেব গম্ভীর স্বরে বললেন, " তাতে কি হয়েছে মার্গট। যীশুও তো তাঁর শিষ্যদের পা ধুইয়ে দিয়েছিলেন।"
নিবেদিতার মুখে এসে গেছিল, " কিন্তু স্বামীজি, সেতো যীশুর শেষ সময়ে।" সামলে নিলেন। একথা তো গুরুদেবের সামনে বলা যায় না।
কলকাতায় ফেরত যাবার জন্য বেলুড়ের ঘাট থেকে নৌকায় উঠতে হবে নিবেদিতাকে। নৌকায় ওঠবার আগে গুরুদেবকে প্রণাম করলেন নিবেদিতা।
গুরুদেব অদ্ভুত গম্ভীর স্বরে বললেন, " মার্গট, কি আশীর্বাদ করি তোমাকে বলতো। "
একটু অবাকই হলেন নিবাদিতা। গুরুদেব তো কখনো এই ভাবে কথা বলেন না। সামলে নিয়ে বললেন, " আপনার যা ইচ্ছা স্বামীজি। "
প্রিয় শিষ্যার মস্তক স্পর্শ করলেন স্বামীজি। আবার সেই ধীর গম্ভীর স্বরে বললেন, " মার্গট, মায়ের মত স্নেহশীলা হও। বীর রমণী হও। হোমশিখার মত পবিত্র হও। তোমাকে অন্তর থেকে আশীর্বাদ করছি, তোমার মধুর ব্যবহারে সবার হৃদয় যেন জুড়িয়ে যায়।"
আশীর্বাদ গ্রহণ করে নৌকার দিকে এগিয়ে গেলেন নিবেদিতা। কানে এল গুরুদেব ধীর স্বরে গাইছেন -
জুড়াইতে চাই কোথায় জুড়াই
কোথা হতে আসি কোথা ভেসে যাই
ফিরে ফিরে আসি কত কাঁদি হাসি
যাই যাই কোথা কূল কি নাই...
নৌকা বেলুড়ের ঘাট ছেড়ে মাঝ গঙ্গার দিকে এগিয়ে গেল। দূর থেকেও নিবেদিতা অনুভব করলেন স্বামীজি তখনো দাঁড়িয়ে আছেন ঘাটে। তাকিয়ে আছেন তার অপসৃয়মান নৌকার দিকে। গুরু - শিষ্যার এই শেষ দেখা।
(৩)
খবর পেয়ে অনেক ভক্ত ও দর্শনার্থীরা আসছেন ক্রমাগত। স্বামীজিকে শেষ দেখা দেখে প্রণাম জানিয়ে যাচ্ছেন। স্বামীজির নশ্বর দেহের সামনে বসে আছেন ব্রহ্মচারী নন্দলাল, ভক্ত নিবারণচন্দ্র, ভক্ত চন্দ্রশেখর চট্টোপাধ্যায়, চন্দ্রশেখরের ভ্রাতা দুলালশশী ও নিবেদিতা।
অন্যান্য গুরুভাইরা সৎকারের যোগাড় যন্ত্র করতে ব্যস্ত। শরৎ মহারাজ (স্বামী সারদানন্দ) গেছেন বালি পৌর প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অনুমতি সংগ্রহ করতে, যাতে স্বামীজির পূর্ব ইচ্ছানুযায়ী তাঁর দাহকার্য্য বেলুড়ের গঙ্গাতীরেই সম্পন্ন করা যায়।
হঠাৎই নিবেদিতা নীরবতা ভঙ্গ করলেন। মৃদু স্বরে বললেন, " আপনারা যদি কেউ দয়া করে একটু ঠাকুরের গান করেন তবে খুব ভালো হয়।"
ভক্ত নিবারণচন্দ্র গান গাইতে পারতেন তাই তিনি গান শুরু করলেন।
" মজলো আমার মন ভ্রমরা শ্যামাপদ নীলকমলে,
যত বিষয় মধু তুচ্ছ হল, কামাদি কুসুম সকলে.... "
এভাবে এই রকম পরিস্থিতিতে কখনো তাকে গান গাইতে হবে, ভাবেননি নিবারণচন্দ্র। গলা ধরে আসছে তার। কিন্তু একটার পর একটা গান গেয়ে চলেছেন।
" যতনে হৃদয়ে রেখ আদরিণী শ্যামা মা কে,
মন তুমি দেখ আর আমি দেখি আর যেন কেহ নাহি দেখে..."
গান শেষ হল। আবার চোখ মুছতে মুছতে নতুন গান ধরলেন নিবারণচন্দ্র। শ্রীশ্রী ঠাকুরের খুব প্রিয় গান ছিল এটি।
" গয়া গঙ্গা প্রভাসাদি কাশী কাঞ্চী কেবা চায়
কালী কালী কালী বলে অজপা যদি ফুরায়
ত্রিসন্ধ্যা যে বলে কালী, পূজা সন্ধ্যা সে কি চায়
সন্ধ্যা তার সন্ধানে ফেরে কভু সন্ধি নাহি পায়..."
বেলা একটা বেজে গেছে। কখন যে শরৎ মহারাজ ঘরে প্রবেশ করেছেন কেউ জানতে পারেন নি। গান থামলে শরৎ মহারাজ করুণ কণ্ঠে বললেন, " বাবারা, স্বামীজি চলে যাওয়াতে আমরা সবাই খুব ভেঙে পড়েছি। আমাদের বল টুটে গেছে। তোরা সকলে ধরাধরি করে স্বামীজির দেহখানি নীচে নামিয়ে আনতে পারবি? "
নিবারণচন্দ্র, চন্দ্রশেখর, দুলালশশী ও ব্রহ্মচারী নন্দলাল স্বামীজির নশ্বর দেহ সাবধানে বহন করে সিঁড়ি দিয়ে ধীরে ধীরে নেমে গেলেন।
ওদিকে ঘরে তখন শরৎ মাহারাজ ও নিবেদিতা দাঁড়িয়ে। নিবেদিতা শরৎ মহারাজকে জিজ্ঞাসা করলেন, " গুরুদেবের গেরুয়া বস্ত্র থেকে ছোট একটা টুকরো কি আমি নিতে পারি? "
শরৎ মহারাজ সম্মতি দিলেন। কিন্তু হাতের কাছে ছুরি কাঁচি কিছু না পেয়ে নিবেদিতা বললেন, " এখন নয়, পরে নেব। "
শরৎ মহারাজও ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। অনেক কাজ তাঁর এখন। ঘরের মধ্যে একা শুধু নিবেদিতা একা দাঁড়িয়ে। কত প্রশ্ন তাঁর অন্তরে। কিন্তু এখন তো আর গুরুদেব নেই তাই কার কাছে এইসব প্রশ্নের উত্তর পাবেন জানেন না তিনি।
আচ্ছা গুরুদেব কি বুঝতে পেরেছিলেন যে তিনি আর বেশিদিন নেই। তাই শেষ সাক্ষাতের দিন ওইরকম ব্যবহার করেছিলেন। আবার বছর দুয়েক আগে গুরুদেব জোসেফিন ম্যাকলাউডকে যে চিঠি লিখেছিলেন আলমোড়া থেকে, সেই চিঠি পড়েও তো মনে হয় গুরুদেবের আর ইচ্ছা ছিলনা পৃথিবীতে থাকার। তার মানে তিনি কি বুঝতে পেরেছিলেন যে কাজের জন্য তিনি পৃথিবীতে এসেছিলেন তা প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। আর তাই তাঁর আর পৃথিবীতে বেশি দিন থাকার ইচ্ছা নেই। অন্তত তাঁর চিঠি পড়ে তো তাই মনে হয়।
কি অপূর্ব সেই চিঠি।
প্রিয় জো,
.....আমি যে জন্মেছিলাম তাতে খুশি। এত যে কষ্ট পেয়েছি তাতেও খুশি। জীবনে যে বড় বড় ভুল করেছি তাতেও খুশি। আর এখন যে নির্বাণের শান্তি সমুদ্রে ডুব দিতে যাচ্ছি তাতেও খুশি।
আমার জন্য সংসারে ফিরতে হবে এমন বন্ধনে আমি কাউকে ফেলে যাচ্ছি না। অথবা এমন বন্ধন আমি কারও থেকে নিয়ে যাচ্ছি না। দেহটা গিয়েই আমার মুক্তি হোক, অথবা দেহ থাকতে থাকতেই মুক্ত হই।
সেই পুরানো " বিবেকানন্দ" কিন্তু চলে গেছে। চিরদিনের জন্য চলে গেছে - আর ফিরছে না। শিক্ষাদাতা, গুরু, নেতা, আচার্য্য বিবেকানন্দ চলে গেছে। পড়ে আছে কেবল সেই বালক, প্রভুর সেই চিরশিষ্য চিরপদাশ্রিত দাস.....
ব্যক্তিগত চিঠি হলেও এই চিঠির কথা মিস ম্যাকলাউড নিবেদিতা কে জানিয়েছিলেন। বলেছিলেন, " মার্গারেট, এই অদ্ভুত সুন্দর চিঠিটি কতবার যে পড়েছি তার ঠিক নেই। আরো কতবার যে পড়ব তারও ঠিক নেই। চিঠি পড়ে আমার মনে হয়েছে স্বামীজি এই চিঠি আমাকে লেখেননি। এই চিঠি তিনি লিখেছেন অনন্তকালকে উদ্দেশ্য করে। তিনি যোগাযোগ করতে চাইছেন অসীমের সাথে।"
এই সব পুরানো কথা মনে পড়াতে একটু অভিমান হয় নিবেদিতার। গুরুদেব সবই জানতেন কিন্তু তাকে কখনো কিছু বলেন নি। এত মার্গট মার্গট করতেন কিন্তু কখনো এই ব্যাপারের কোন আভাষ পর্য্যন্ত দেননি। এমনকি শেষ সাক্ষাতের দিনও না। তাকে কি গুরুদেব বিশ্বাস করতেন না পুরোপুরি।
পরক্ষণেই লজ্জিতা হন নিবেদিতা। ছি ছি এ তিনি কি করছেন। গুরুদেবের রায়কে প্রশ্ন করছেন। তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন নিবেদিতা। সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসেন নীচে।
(৪)
নীচে নেমে এলেন নিবেদিতা। স্বামীজির নশ্বর দেহ নীচের দালানে নানা রকম পুষ্পে সজ্জিত পালঙ্কের উপর স্থাপন করা হয়েছে। কিছু আপেল বেদানা আঙুর ও নাশপাতি স্বামীজির বক্ষের উপর সাজিয়ে রাখা আছে।
বুড়ো গোপাল দাদা (স্বামী অদ্বৈতানন্দ) নন্দলাল ব্রহ্মচারীকে বললেন, " ওরে নন্দলাল, স্বামীজি তোকেই সবথেকে বেশি ভালবাসতেন। আজ তাঁর শেষ পূজা তোর হাতেই হোক।"
রাখাল মহারাজ (স্বামী ব্রহ্মানন্দ) সহ স্বামীজির অন্যান্য গুরুভাইরাও এই প্রস্তাবের সমর্থন করলেন।
ব্রহ্মচারী নন্দলাল প্রথমে স্বামিজীর উদ্দেশ্যে পুষ্পমালা, ফলমূল ও মিষ্টান্ন নিবেদন করলেন। তারপর আরতি ও স্তোত্রপাঠ করলেন।
এই সময় একজন ভক্ত স্বামীজির একটি শেষ আলোকচিত্র গ্রহণ করবার কথা বললেন। কিন্তু রাখাল মহারাজ নিষেধ করলেন। বললেন, " স্বামীজির কত ভাল ভাল ফটো রয়েছে। কিন্তু এই বিষাদ মাখা ছবি সবাইকে কষ্টই দেবে।"
এরপর ব্রহ্মচারী সন্ন্যাসী ও উপস্থিত ভক্তেরা স্বামীজির চরণে পুষ্পাঞ্জলি প্রদান করলেন। তারপর স্বামীজির চরণতল অলক্তকে রঞ্জিত করে তাঁর চরণের ছাপ নিলেন অনেকে। নিবেদিতা এগিয়ে এলেন ও একটা নতুন রুমালে গুরুদেবের চরণের ছাপ নিলেন। ভক্ত চন্দ্রশেখর একটি মার্শাল নীল গোলাপ চন্দনে চর্চিত করে স্বামীজির চরণতলে তা স্পর্শ করিয়ে নিজের কাছে স্মৃতিচিহ্ন স্বরূপ রেখে দিলেন।
তারপর অগ্নিসংস্কারের প্রস্তুতি শুরু হল। স্বামীজির পূর্ব ইচ্ছানুযায়ী বেলুড়ের গঙ্গাতীরেই তাঁর দাহকার্য্য সম্পন্ন হবে। বালি পৌর প্রতিষ্ঠান সেই অনুমতি দিয়েছে।
শরৎ মহারাজ আবার ওই চারজনকেই, অর্থাত ব্রহ্মচারী নন্দলাল, ভক্ত নিবারণচন্দ্র, ভক্ত চন্দ্রশেখর ও ভক্ত দুলালশশীকে, পালঙ্কখানি বহন করে, অগ্নিসংস্কারের স্থানে নিয়ে যাবার অনুমতি দিলেন ও অন্যরা সবাই শবানুগমন করলেন।
সেদিন সকালের দিকে এক পশলা বৃষ্টি হওয়াতে মাঠ কর্দমাক্ত পিচ্ছিল ও চোরপুলি কাঁটায় পরিপূর্ণ ছিল। তাই চারজন বহনকারী খুব সন্তর্পণে পালঙ্কটিকে বহন করে নিয়ে গিয়ে চন্দন কাঠের চিতা বেদীর উপর স্থাপন করলেন।
চিতায় অগ্নি সংযোগ করা হল। প্রথমে ধিক ধিক করে জ্বলতে জ্বলতে ধূ ধূ করে চিতা জ্বলে উঠল। চিতার ধূম উড়তে লাগল আকাশে।
বেলতলার কাছে বাঁধান রকে বসে এই মর্মান্তিক দৃশ্যের সাক্ষী হয়ে রইলেন গিরিশ চন্দ্র ঘোষ, বসুমতী পত্রিকার উপেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, সাহিত্যিক জলধর সেন, মাস্টার মহাশয় (শ্রীম), অক্ষয়কুমার সেন ও অন্যান্য গৃহী ভক্ত সন্ন্যাসী ও ব্রহ্মচারীরা।
ভক্ত নিবারণচন্দ্র আবার গান শুরু করলেন। স্বামীজির খুব প্রিয় গান। প্রথম যেদিন স্বামীজির সাক্ষাৎ হয়েছিল শ্রী শ্রী ঠাকুরের সাথে ১৮৮১ সালে, সুরেন্দ্রনাথ মিত্রের গৃহে, তখন তিনি এই গানটাই শুনিয়েছিলেন তাঁকে। গানটি লিখেছিলেন অযোধ্যা নাথ পাকড়াশী, তৎকালীন ব্রাহ্ম সমাজের একজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি।
মন চলো নিজ নিকেতনে
সংসার বিদেশে বিদেশীর বেশে
ভ্রম কেন অকারণে
মন চলো নিজ নিকেতনে।
বিষয়-পঞ্চক আর ভূতগণ
সব তোর পর কেহ নয় আপন
পরপ্রেমে কেন হয়ে অচেতন ভুলিছ আপনজনে
মন চলো নিজ নিকেতনে।
সত্যপথে মন কর আরোহণ,
প্রেমের আলো জ্বালি চল অনুক্ষণ
সঙ্গেতে সম্বল রাখো পূণ্যধন
গোপনে অতি যতনে
লোভ-মোহাদি পথে দস্যুগণ,
পথিকের করে সর্বস্ব শোষণ
পরম যতনে রাখোরে প্রহরী
শম, দম দুইজনে
মন চলো নিজ নিকেতনে।
সাধুসঙ্গ নামে আছে পান্থধাম,
শ্রান্ত হলে তথায় করিবে বিশ্রাম
পথভ্রান্ত হলে শুধাইবে পথ সে পান্থনিবাসী গণে।
যদি দেখ পথে ভয়েরই আকার
প্রাণপণে দিও দোহাই রাজার
সে পথে রাজার প্রবল প্রতাপ,
শমণ ডরে যার শাসনে।
মন চলো নিজ নিকেতনে।
সংসার বিদেশে বিদেশীর বেশে
ভ্রম কেন অকারণে।
হঠাৎই গিরিশচন্দ্র শোকানুভূতি সংযত করতে না পেরে হাহাকার করে উঠলেন, " নরেন, কোথায় তুমি বেঁচে থেকে, আমার কথা লোকের কাছে বলে ঠাকুরের মহিমা প্রচার করবে - কিন্তু সে সাধে পোড়া বিধি হল বাদী। আমি বুড়ো বেঁচে রইলুম তোমার এই দৃশ্য দেখবার জন্য। তুমি তো ঠাকুরের ছেলে ঠাকুরের কোলে গিয়ে উঠলে। বল দেখি এখানে আমাদের কি দশায় ফেলে অকালে চলে গেলে। নিশ্চয় আমাদের কপাল ভেঙেছে। "
এত কিছুর মধ্যেও কিন্তু নিবেদিতার যেন কোনদিকে হুঁশ নেই। আচ্ছন্নের মত বসে আছেন তিনি।
চিতাগ্নি আবার লেলিহান শিখায় জ্বলে উঠল। এক ঘোরের মধ্যে যেন নিবেদিতা উঠে দাঁড়ালেন। এগিয়ে গেলেন চিতার দিকে। তারপর জ্বলন্ত চিতার নিকটবর্তী হয়ে চিতাকে বেষ্টন করে প্রদক্ষিণ করতে লাগলেন।
রাখাল মহারাজের আশঙ্কা হল যে চিতাগ্নির অত নিকটে যাবার দরুণ নিবেদিতার পরিচ্ছদ অগ্নিস্পর্শ করতে পারে। সেকথা তিনি কানাই মহারাজকে বললেন। কানাই মহারাজ নিবেদিতার হাত ধরে খানিকটা তফাতে গঙ্গার ধারে নিয়ে গিয়ে বসালেন। প্রবোধ দিলেন, " ভগিনী, সন্ন্যাসীর মৃত্যুতে শোক করতে নেই। স্বামীজি তোমার গুরু ছিলেন। সুখে দুঃখে বিগতস্পৃহ থাকবার শিক্ষা তিনি তো তোমাকে দিয়েছন। তাই স্মরণ করে সংযত হও।"
ধীরে ধীরে দিনমণি পাটে বসলেন। চিতাগ্নিও নির্বাপিত হল। সন্ন্যাসী ও ভক্তজনেরা গঙ্গাজল দিয়ে চিতা ধৌত করছেন। অস্তাচলের দিকে ধাবিত সূর্যদেবকে প্রণাম করে তর্পন করছেন।
বেল গাছ তলায় বসে আছেন নিবেদিতা। তাঁর সঙ্গে যে ঘড়িটি আছে তাতে ঠিক ছটা বাজে।
ঠিক এমন সময় কয়েকজন ব্রহ্মচারী ভেতরের রামকৃষ্ণ মন্দিরে সন্ধ্যা আরতি শুরু করলেন। সন্ন্যাসীর মৃত্যুতে শোক করতে নেই যে। সন্ন্যাসীর কর্তব্য যে বড় কঠোর বড় কঠিন।
ভব-সাগর-তারণ-কারণ হে,
রবি-নন্দন-বন্ধন-খণ্ডন হে,
শরণাগত কিঙ্কর ভীত মনে,
গুরুদেব দয়া কর দীনজনে।।
হৃদিকন্দর-তামস-ভাস্কর হে,
তুমি বিষ্ণু প্রজাপতি শঙ্কর হে,
পরব্রহ্ম পরাৎপর বেদ ভণে,
গুরুদেব দয়া কর দীনজনে।।
মন-বারণ-শাসন-অঙ্কুশ হে,
নরত্রাণ তরে হরি চাক্ষুষ হে,
গুণগান-পরায়ণ দেবগণে,
গুরুদেব দয়া কর দীনজনে।।
কুলকুণ্ডলিনী-ঘুম-ভঞ্জক হে,
হৃদি-গ্রন্থি-বিদারণ-কারক হে,
মম মানস চঞ্চল রাত্রদিনে,
গুরুদেব দয়া কর দীনজনে।।
রিপু-সূদন-মঙ্গল-নায়ক হে,
সুখ-শান্তি-বরাভয়-দায়ক হে,
ত্রয়তাপ হরে তব নাম গুণে,
গুরুদেব দয়া কর দীনজনে।।
অভিমান-প্রভাব-বিমর্দ্দক হে,
গতিহীন জনে তুমি রক্ষক হে,
চিত-শঙ্কিত-বঞ্চিত-ভক্তিধনে,
গুরুদেব দয়া কর দীনজনে।।
তব নাম সদা শুভ-সাধক হে,
পতিতাধম-মানব-পাবক হে,
মহিমা তব গোচর শুদ্ধ মনে,
গুরুদেব দয়া কর দীনজনে।।
জয় সদ্গুরু ঈশ্বর-প্রাপক হে,
ভব-রোগ-বিকার-বিনাশক হে,
মন যেন রহে তব শ্রীচরণে,
গুরুদেব দয়া কর দীনজনে।।
সব কিছুই নিবেদিতার কানে যাচ্ছে কিন্তু কোন কিছুই যেন অন্তর স্পর্শ করছে না। এমন সময় তাঁর জামার হাতায় কে যেন ঈষৎ টান দিল। আর কার যেন মৃদু কন্ঠ শোনা গেল, " মার্গট"।
ঝটিতি পেছন ফিরে তাকালেন নিবেদিতা। কে? কে ডাকল? এই নামে তো একমাত্র তাঁর গুরুদেবই তাঁকে ডাকতেন। তাহলে কে এখন ডাকল তাঁকে।
পেছন ফিরে কিন্তু কাউকে দেখতে পেলেন না নিবেদিতা। কিন্তু যখন পায়ের দিকে তাকালেন তখন স্তম্ভিত হয়ে গেলেন নিবেদিতা। এ কি সম্ভব। চিতাগ্নির থেকে কখন যেন তাঁর পায়ের কাছে উড়ে এসে পড়েছে এক টুকরো গৈরিক বস্ত্রখণ্ড, যা তিনি যাচ্ঞা করেছিলেন শরৎ মহারাজের কাছে। পরে শোকের প্রবাহে তিনি এই ব্যাপারটা ভুলে গেছিলেন। কিন্তু তাঁর গুরুদেব যে তাঁর প্রার্থনা ভোলেননি, মরদেহ ত্যাগের পরেও, তার প্রমাণ তার পায়ের কাছেই পড়ে আছে।
সমাধির অপর পার থেকে এযেন গুরুদেবের এক স্নেহভরা আশীর্বচন - " মার্গট,এটা তুমি চেয়েছিলে না। তোমার জন্য পাঠালাম। "
পরম যত্নে বস্ত্রখণ্ডটি তুলে নিলেন নিবেদিতা। তপস্বীনী নিবেদিতা সারাদিন নিজের অন্তরের মহাশোককে সংযত রেখেছিলেন। আর পারলেন না। ভুলে গেলেন যে সন্ন্যাসীর মৃত্যুতে শোক করতে নেই। গুরুদেবের থেকে কৃপা ভিন্ন তাঁর তো চাইবার কিছু নেই। এই অভাবিত কৃপার স্পর্শে অঝোর ধারে ঝরে পড়তে লাগল অশ্রু তাঁর দুনয়ন বেয়ে।
প্রকৃতিও যেন শোকার্তা হলেন এই সন্ন্যাসিনীর শোকে। শুরু হল বৃষ্টি।
সমাপ্ত
কৃতজ্ঞতা স্বীকার - বিবেকানন্দ চর্চা করছি সেই স্কুল জীবন থেকে। অনেক লেখকের কাছেই ঋণী আমি। তাই বিশেষ কারুর নাম লিখতে পারছি না। কেননা সবার নাম লিখতে গেলে তা এক মহাভারত হয়ে যাবে। তাঁদের সবার কাছেই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।
তবে এটা বলতে পারি অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের বই বীরেশ্বর বিবেকানন্দ আমাকে মুগ্ধ করে যখন আমি স্কুলের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র। তখন থেকেই আমার বিবেকানন্দ চর্চার শুরু। তাই আমার বিবেকানন্দ চর্চার গুরু হলেন অচিন্ত্য কুমার সেনগুপ্ত।
এই লেখাটিতে কল্পনা তত টুকুই আছে যতটুকু না থাকলেই নয়।
0 Comments:
Post a Comment
Subscribe to Post Comments [Atom]
<< Home