Friday, January 15, 2021

সিকন্দর - অল - সানি

 


সিকন্দর - অল - সানি

(১)

স্থান : দিল্লির কিলোখেড়ির (মতান্তরে কালুগড়ি) দুর্গ

কাল:  ১২৯১ সাল

নিজের কক্ষে পিঞ্জরাবদ্ধ সিংহের মত পায়চারি করছেন আলি গুর্শাস্প। এত অপমান, এত বেইজ্জতির মুখোমুখি আগে কখনো  হতে হয়নি গুর্শাস্পকে। তাও আবার সেই বেইজ্জতি আর অপমান এসেছে কিনা নিজেরই নিকাহ করা বেগমের কাছ থেকে। নাহয় হলেনই বা বেগম সাহেবা দিল্লির সুলতানের প্রিয় শাহজাদী। তা বলে তার এত অহঙ্কার এত ঘমণ্ড হবে যে নিজের শৌহরকেও এইভাবে বেইজ্জতি করতে হবে। গুর্শাস্প নিজে তো তাকে কখনো নিকাহ করতে চাননি। সুলতানের অনুরোধেই তিনি শাহজাদীকে নিকাহ করেছেন।

কয়েকমাস হল, দিল্লির সুলতান হয়েছেন জালাল - উদ্দিন - ফিরোজ - খিলজি। আলি গুর্শাস্প তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র। ছোটবেলায় পিতৃহীন গুর্শাস্পের সাহস জেদ আর উচ্চাকাঙ্ক্ষা দেখে সুলতান তাকে খুব স্নেহ করেন। তাই সুলতান নিজের সব থেকে সুন্দরী ও প্রিয় শাহজাদীর নিকাহ করেছেন গুর্শাস্পের সঙ্গে।  আলি গুর্শাস্প এখন শুধু আর সুলতানের ভ্রাতুষ্পুত্রই নন, তার প্রিয় জামাইও বটে। কিছুদিন হল সুলতান গুর্শাস্পকে কড়ার সুবেদার নিযুক্ত করেছেন। 

গঙ্গা নদীর তীরে বর্তমান এলাহাবাদ শহরের পশ্চিম দিকে অবস্থিত কড়া সেসময় ছিল একটা প্রসিদ্ধ জনপদ। কড়ার প্রাচীন হিন্দু নাম ছিল কৌশাম্বী।

(২)

গুর্শাস্পকে শীঘ্রই দিল্লি ছেড়ে কড়ায় চলে যেতে হবে। তাই আজ তিনি নব পরিণীতা বেগম সাহেবা কে বলতে গেছিলেন যে তিনিও যেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব প্রস্তূত হয়ে নেন। কেননা তিনি বেগম সাহেবাকেও সাথে নিয়ে যেতে চান। শৌহর যেখানে থাকবে বেগম সাহেবারও তো ঘর সংসারের প্রয়োজনে  সেখানেই থাকা উচিৎ। তাই তো স্বাভাবিক।  কিন্তু কড়ায় যাবার কথা শুনে বেগম সাহেবা যে ভাষায় তাকে বেইজ্জত করলেন, তা গুর্শাস্পের মনে তীব্র জ্বালা ধরিয়ে দিয়েছে। এসম্বন্ধে সুলতানকেও বলে কিছু হবেনা। এই শাহজাদীটিকে সুলতান অত্যন্ত স্নেহ করেন। তাই তিনিও শাহজাদীরর ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাকে জোর করে কড়ায় পাঠাবেন না। যদিও গুর্শাস্প নিজেও সুলতানের প্রিয়পাত্র।

সারা রাত ঘুম হয়না গুর্শাস্পের। সকালে উঠে গোসল করে ফজরের নামাজ পাঠ করার পর মন একটু শান্ত হয়।

সুলতানের অনুমতি নিয়ে গুর্শাস্প নিছক একাই যাত্রা করেন কড়ার দিকে নিজের নতুন পদভার গ্রহণ করার জন্য।

দিল্লি ছেড়ে যেতে যেতে মনে মনে ভয়ানক এক কসম খান গুর্শাস্প।

" অভিমানী শাহজাদী, কিছুদিন আগেও তুমি ছিলে এক সাধারণ জায়গীরদারের বেটি। আর আজ আল্লাহ্‌র দোয়ায় শাহজাদী হয়ে তুমি নিজের শৌহরের সাথে কিভাবে পেশ আসতে হয় তাও ভুলে গেছ। এত তোমার অহঙ্কার, এত তোমার অভিমান, এত তোমার গরুর। বেশ, আমি আলি গুর্শাস্প, তোমার শৌহর, আজ কসম নিলাম, যে তোমার ওই অভিমান, তোমার ওই গরুর, একদিন চূর্ণ করে দিল্লির পথের ধূলোয় মিশিয়ে দেব। যে দিল্লি থেকে আজ আমাকে বেইজ্জত হয়ে চলে যেতে হচ্ছে।

ইন্তেজার কর শাহজাদী, আমার ইন্তেজার কর।" 

(৩)

তুর্কি বলবন বংশের শেষ সুলতান কায়কোবাদ পক্ষাঘাত রোগে আক্রান্ত হয়ে চলৎশক্তিহীন হয়ে পড়েন। তার পক্ষে আর দিল্লির সুলতানি করা সম্ভব হচ্ছিল না। এর ফলে দিল্লিতে ভয়ানক অরাজকতা দেখা দেয়। তাই সুলতান কায়কোবাদের অধীনস্থ কয়েকজন প্রভাবশালী আমির সুলতান কায়কোবাদকে সিংহাসনচ্যুত করে, তার নাবালক পুত্র কায়মুর্সকে সুলতান শামসুদ্দীন নাম দিয়ে দিল্লির তখতে বসায়।

বলাই বাহুল্য সুলতান শামসুদ্দীন ছিলেন নাম মাত্র সুলতান। তাকে সামনে রেখে প্রকৃতপক্ষে আমিরেরাই শাসন ব্যবস্থা চালাতে থাকেন। কিন্তু দিল্লিতে অরাজকতা আর অশান্তি দিন দিন বেড়েই চলে। কেননা আমিররা সবাই নিজের নিজের স্বার্থসিদ্ধি করছিলেন।

মালিক ফিরোজ ছিলেন সেসময় বরণ এর জায়গীরদার এবং সামানার আরিজ - ই - মৌমালিক (রক্ষা মন্ত্রী)। 

মালিক ফিরোজ এই অরাজকতার সুযোগে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। একদিন রাতের অন্ধকারে হঠাৎ নিজের বাছা বাছা কয়েকজন সর্দার ও মাত্র ৫০০ সৈনিক নিয়ে দিল্লি আক্রমণ করেন এবং নাবালক সুলতান শামসুদ্দীনকে অপহরণ করেন।

মালিক ফিরোজের অধীনস্থ এক সর্দারের পিতাকে সুলতান কায়কোবাদ এক সময় মৃত্যদণ্ড দিয়েছিলেন। প্রতিশোধ স্পৃহায় জ্বলতে জ্বলতে সেই সর্দার এখন সুযোগ পেয়ে পক্ষাঘাতগ্রস্ত চলৎশক্তিহীন সুলতান কায়কোবাদকে বন্দী করে হাত পা বেঁধে যমুনায় ফেলে দেয়। 

যুগ যুগ ধরে বয়ে চলা যমুনা, ইন্দ্রপ্রস্থ ও শাহি দিল্লির হাজার হাজার বছরের ইতিহাসের ও নানা ঘাত প্রতিঘাতের নীরব সাক্ষী যমুনা, দিল্লির শেষ তুর্কি সুলতান হতভাগ্য কায়কোবাদকে নিজের আঁচলের তলায় লুকিয়ে ফেলে পরম শান্তি প্রদান করে।

তবে যে খিলজি সর্দার এই কাণ্ডটি ঘটিয়েছিল তার নাম কিন্তু জানা যায়না। ইতিহাসে তা লেখা নেই।

এরপর আর মালিক ফিরোজের দিল্লির সুলতান হবার পথে কোন বাধা রইলো না।

(৪)

স্থান: দিল্লির কিলোখেড়ির দুর্গ।
কাল: ১৩ জুলাই ১২৯০ সাল।

৭০ বছরের মালিক ফিরোজ, জালাল-উদ্দীন-ফিরোজ-খিলজি, নাম গ্রহণ করে দিল্লির সুলতান হলেন। সুলতান কায়কোবাদের এন্তেকালের সঙ্গে সঙ্গে দিল্লিতে তুর্কিদের রাজত্ব শেষ হল। কিলোখেড়ির দুর্গে উড্ডীন হল খিলজি বংশের পতাকা।

তৎকালীন দিল্লি দরবারের আমিররা ও দিল্লির সাধারণ অধিবাসীরা বেশির ভাগই ছিল তুর্কি বংশজাত। আর নতুন সুলতানের আদি বাসস্থান ছিল আফগানিস্তান। তার উপর আবার তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাধারণ বংশের সন্তান। তথাকথিত বংশ মর্য্যাদা ও শাহী  আভিজাত্য তার ছিলনা। তুর্কি সুলতানকে সরিয়ে একজন আফগান দিল্লির সুলতান হয়েছে, একথা মেনে নিতে সবারই কষ্ট হয়েছিল। কিন্তু দিল্লিতে তখন এতই অরাজকতা, যে দিল্লির শাহী তখত সুলতানহীন থাকার চেয়ে একজন আফগান সুলতানও মন্দের ভাল, এই ভেবে কেউ কোন প্রতিবাদ করল না।

কিন্তু অল্প কিছুদিনের মধ্যেই দিল্লির সাধারণ লোকেদের মন জয় করে নিলেন নতুন খিলজি সুলতান জালাল-উদ্দীন-ফিরোজ খিলজি। তার বিশাল হৃদয় ও দয়া দাক্ষিণ্য  ছিল প্রায় কিংবদন্তীর পর্যায়ের।

সাধারণ জায়গীরদার ছিলেন তিনি। দিল্লির শাহী তখতে বসার ও সুলতান হবার কোনরকম সম্ভাবনা ছিলনা কোন ভাবেই।

কিন্তু পরম করুণাময় আল্লাহর কৃপায়, জীবন সায়াহ্নে এসে, ৭০ বছর বয়েসে তিনি দিল্লি তথা হিন্দুস্তানের সুলতান হলেন। তাই তিনি ইসলামের দয়া, করুণা, ও ক্ষমার নীতি মেনে চলতেন।

সুলতান জালাল-উদ্দীন-ফিরোজ-খিলজি সম্বন্ধে যে ঘটনাগুলো ইতিহাসে বহুল প্রচারিত তার কয়েকটা এখানে উল্লেখ করা অপ্রাসঙ্গিক হবে না।

তিনি যখন সুলতান হলেন তখন তুর্কি বলবন বংশের মালিক ছজ্জু ছিলেন কড়ার সুবেদার। কয়েক মাস পর তিনি নতুন সুলতানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন। সুলতান নিজের পুত্র আরকালি খানকে বিদ্রোহ দমন করতে পাঠালেন। আরকালি খান মালিক ছজ্জুকে বদায়ুনের কাছে পরাস্ত করলেন ও বন্দী করে দিল্লি নিয়ে এলেন।

সেসময় বিদ্রোহীদের শাস্তি ছিল মৃত্যুদণ্ড। কিন্তু সুলতান, মালিক ছজ্জুকে মাফ করলেন। শাহী ভোজে আপ্যায়িত করলেন এবং মুলতানে তার বসবাসের ব্যবস্থা করে দিলেন। কড়ার সুবেদার করলেন নিজের ভ্রাতুষ্পুত্র তথা জামাই আলি গুর্শাস্পকে।

তার প্রহরীরা যখন কোন চোর ডাকাত বা ঠগকে বন্দী করত, তখন প্রায়শ:ই তিনি তাদের কোন শাস্তি না দিয়ে,  স্বয়ং নিজে তাদের কোরাণ শরীফ থেকে উপদেশ দিয়ে বোঝাতেন যে, চুরি ডাকাতি করা কত খারাপ। তারপর হয় তাদের মুক্তি দিতেন বা খুব বেশি হলে তাদের দিল্লি থেকে নিষ্কাশিত করে দিতেন। যদিও তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থায় এসব অপরাধের শাস্তি ছিল প্রানদণ্ড। একবার কয়েকশত খুনি, ডাকাত ও চোরকে নিজের প্রহরীদের পাহাড়ায় সুদূর বঙ্গে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। সেখানে গিয়ে তাদের মুক্তি দেওয়া হয়েছিল এই ভেবে যে তারা ওখানে সৎভাবে নিজের জীবন নতুন ভাবে শুরু করবে।

১২৯০ সালে রাজপুতানার রণথোম্ভর দুর্গ আক্রমণ করতে গিয়ে তিনি বুঝলেন যে দুর্গ অধিকার করার জন্য যুদ্ধ করলে দুপক্ষেই প্রচুর প্রাণনাশ হবে। তাই দয়ালু সুলতান অযথা রক্তক্ষয়  না করে ফেরত চলে আসেন ও বলেন,  " ওই দুর্গের মূল্য আমার কাছে একজন সাচ্চা মুসলমানের একটা চুলের থেকে বেশি নয়।"

তার এক সভাসদ তাজ-উদ্দীন-কুচি একবার এক বড় ভোজের আয়োজন করেছিলেন ও সুলতানকে নিমন্রণ করেছিলেন। সেখানে দুজন অসন্তুষ্ট আমিরও উপস্থিত ছিলেন।

তাদের মধ্যে একজন আরেকজনকে বলছিলেন যে,  " আমার ইচ্ছা করে যে সুলতানের বুকে এই ছুরি বসিয়ে দি।"

অন্যজন উত্তর দেন, " আমার ইচ্ছা করে সুলতানের মুণ্ডচ্ছেদ করি। "

সুলতান দুজনের কথাই শুনতে পেয়েছিলেন। অন্য কোন সুলতান হলে তৎক্ষণাত ওই দুই আমিরকে বন্দী করতেন। কিন্তু জালাল-উদ্দীন-ফিরোজ- খিলজি, তাদের সামনে গিয়ে, নিজের তরবারি তাদের সামনে নামিয়ে রেখে বলেন, " বেশ, তোমাদের সাহস থাকে তো এই তরবারির প্রয়োগ আমার উপর করো। "

তখন ওই দুই আমির ক্ষমা চাইবার পথ পায়না। দয়ালু সুলতান তাদের সতর্ক করে দিয়ে ছেড়ে দেন।

এসব ঘটনার দরুণ অনেকেই তাকে দুর্বল সুলতান মনে করতেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তিনি দুর্বল ছিলেন না।

তার সময় মঙ্গোলরা, বিগত দিনের বিখ্যাত মোঙ্গল সেনাপতি, হালাকু খানের নাতি, আব্দুল্লার সেনাপতিত্বে দিল্লি আক্রমণ করে।

এই দুর্ধর্ষ মঙ্গোল বাহিনীকে সুলতান যুদ্ধে পরাস্ত করেন। এই মঙ্গোল বাহিনীর বেশ কিছু সৈনিক সুলতানের কাছে প্রার্থনা করে যে তারা হিন্দুস্তানে থেকে যেতে চায়। এর জন্য তারা ইসলাম ধর্মও কবুল করতে রাজি।

দয়ালু সুলতান তাদের দিল্লি শহরের বাইরে থাকবার অনুমতি দেন। কিন্তু এবার সুলতান ভুল করেছিলেন। কেননা এরাই পরে নানা কারণে দিল্লি সরকারের মাথা ব্যথার কারণ হয়ে উঠেছিল। পরবর্তী মঙ্গোল আক্রমণের সময় এরা নিজেদের জাতভাইদের সাহায্য করেছিল।

ক্রমশ:..



0 Comments:

Post a Comment

Subscribe to Post Comments [Atom]

<< Home