Friday, July 16, 2021

বাঙ্গালির কাঁচা ফলার ও একজন নীলকর সাহেব

 বাঙ্গালি


র কাঁচা ফলার ও একজন নীলকর সাহেব


আপনাদের মধ্যে কজন দীনেন্দ্রকুমার রায়ের লেখা পড়েছেন জানিনা। 


প্রথমেই ওনার পরিচয় দি। দীনেন্দ্রকুমার রায় (২৬/০৮/১৮৬৯ - ২৭/০৬/১৯৪৩) জন্মগ্রহণ করেছিলেন নদীয়ার মেহেরপুরে। পিতার নাম ছিল ব্রজনাথ রায়।


১৮৮৮ সালে মহিষাদল হাইস্কুল থেকে সেই সময়ের প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে কৃষ্ণনগর কলেজে ভর্তি হন। শিক্ষা শেষে তিনি ১৮৯৩ সালে রাজশাহী জেলা জজের অফিসে কর্মজীবন শুরু করেন।


এমন সময় তাঁর কবি রজনীকান্ত সেনের সাথে আলাপ হয়। কবির উৎসাহে ও অনুরোধে দীনেশচন্দ্র একটি ফরাসী উপন্যাসের ইংরেজি অনুবাদ থেকে বাংলায় অনুবাদ করেন। 


এই তাঁর লেখালেখির শুরু। ১২৯৫ বঙ্গাব্দে তাঁর প্রথম লেখা - একটি কুসুমের মর্মকথাঃপ্রবাদ প্রশ্নে- ভারতী ও বালক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।


১৮৯৮ সালে অরবিন্দ ঘোষের বাংলা শিক্ষক নিযুক্ত হয়ে বরোদায় চলে যান। বরোদায় দু'বছর কাটানোর পর আবার কলকাতায় ফিরে আসেন।


১৯০০ সালে সাপ্তাহিক বসুমতী পত্রিকার সহ সম্পাদক নিযুক্ত হন। বসুমতী ছাড়াও তিনি নন্দন কানন মাসিক পত্রিকারও সম্পাদনা করতেন। পরবর্তী কালে তিনি বসুমতীর সম্পাদকও হয়েছিলেন। 


নন্দন কানন সিরিজ বা রহস্য লহরী সিরিজ এ দীনেন্দ্রকুমার ইংরেজি থেকে বাঙ্গলায় অনুবাদের মাধ্যমে গোয়েন্দা রবার্ট ব্লেক ও তার সহযোগী স্মিথ কে বাঙ্গলার পাঠকদের সাথে পরিচিত করান। এই সিরিজে তাঁর লেখা উপন্যাসের সংখ্যা ২১৭ টি। 


এছাড়াও তিনি থ্রিলার ধর্মী উপন্যাসও লিখেছেন। "ইউ বোটের বোম্বেটে" তাঁর লেখা একটি বেশ ভাল এডভেঞ্চার উপন্যাস, অন্তত সেই সময়ের নিরিখে। এই উপন্যাসের বিশেষত্ব হল যে এই উপন্যাসে ডুবোজাহাজ চালনা, ডুবোজাহাজের যুদ্ধ, টর্পেডো ছোঁড়া, ডুবোজাহাজের ভেতরের বর্ণনা ইত্যাদি ছিল, যা ছিল বেশ মনোগ্রাহী ও বাস্তব সম্মত। তাঁর লেখা অন্য উল্লেখ্যযোগ্য গ্রন্থগুলি হল - পট, বাসন্তী, অজয় সিংহের কুঠি, পল্লীচরিত্র, পল্লীকথা, পল্লীবৈচিত্র্য, ঢেঁকির কীর্তি, পল্লীচিত্র ইত্যাদি।


তবে আমার নিজের ব্যাক্তিগত মত হল এই যে তাঁর সবথেকে ভাল লেখাগুলো হল পল্লীগ্রাম ও সমাজ নিয়ে লেখা রচনাগুলো। ১২০ - ১২৫ বছর আগে কেমন ছিল বাঙ্গলার গ্রাম ও তার সমাজ ব্যবস্থা। কেমন ছিল বাঙ্গলার গ্রামের আচার ব্যবহার ও কৃষ্টি। কেমন ছিল বাঙ্গালীর বারো মাসে তের পার্বণ। এই বিষয়গুলো নিয়ে লেখাগুলো সত্যিই অপূর্ব। 


তাঁর একটি এই রকম লেখা "হেমন্তের পল্লী" প্রকাশিত হয়েছিল মাসিক বসুমতীর অগ্রহায়ণ ১৩৪৯ সংখ্যায়। এই লেখায় একজন নীলকর সাহেব বাঙ্গালীর ফলার খাওয়া নিয়ে কি মন্তব্য করেছিলেন তার বেশ সরস বর্ণনা আছে। সেই বর্ণনা আপনাদের সাথে ভাগ করে নিলাম। পড়ে দেখুন। আপনাদের নিশ্চয় ভালো লাগবে।


দীনেন্দ্রকুমার রায় লিখেছেনঃ


...যে সিভিল সাহেবের কথা বলিয়াছি, তিনি নীলকর ছিলেন। তাঁহার নাম জন সিভিল কি জেমস সিভিল ছিল, এত কাল পরে তাহা স্মরণ নাই। শুনিয়াছি, তিনি এক টুপি এক লাঠি সম্বল করিয়া ব্যাবসায় করিবার জন্য বাঙ্গালায় আসিয়াছিলেন। তিনি আমাদের গ্রামের কয়েক মাইল দূরে নীলকুঠি স্থাপন করিয়া নিজের নামানুসারে গ্রামের নাম দিয়াছিলেন 'সিভিল নগর'। স্থানীয় অধিবাসীরা 'সিভিলগঞ্জ' ও বলে।


সিভিল সাহেব দীর্ঘকাল নীলের আবাদে নিযুক্ত থাকিলেও অন্যান্য নীলকরের ন্যায় নিষ্ঠুর ও প্রজাপীড়ক ছিলেন না। সুদীর্ঘকাল নীলের আবাদ করিয়া পরিণত বয়েসে যখন তাঁহার জমিদারি ও কুঠি জিলার কোন বাঙ্গালী জমিদারের নিকট বিক্রয় করিয়া স্বদেশে প্রত্যাগমন করেন, তখন আমরা নয় দশ বৎসরের বালক। সেই সময় শুনিয়াছিলাম-নয় লক্ষ টাকা সঞ্চয় করিয়া তিনি সোনার ভারত ত্যাগ করেন। তিনি তাঁহার বাঙ্গালী কর্ম্মচারীদিগকে স্নেহ করিতেন, এবং তাহাদের দুঃখ বিপদে নানা ভাবে সাহায্য করিতেন। তাহাদের সহিত মিলিয়া মিশিয়া আমোদ উপভোগ করিতেন। এই শ্রেণীর সহৃদয় ও মুক্তহস্ত ইংরেজ একালে এদেশে দেখিতে পাওয়া যায় না। বাল্যকালে তাঁহার সহৃদয়তার অনেক গল্পই শুনিতে পাইতাম।


একবার নায়েব ধনঞ্জয় চৌধুরী তাঁহার বাড়িতে জগদ্ধাত্রী পূজা দেখিতে যাইবার জন্য সিভিল সাহেবকে নিমন্ত্রণ করেন। অন্য কোন নীলকরকে নিমন্ত্রণ করিতে ধনঞ্জয়ের সাহস হইত না। কিন্তু ধনঞ্জয় মনিবের সহৃদয়তার বহু পরিচয় পাইয়াছিলেন। এই জন্যই সাহেবকে তিনি এই অনুরোধ করিতে কুণ্ঠিত হইলেন না।


সিভিল সাহেব বলিলেন, " ওয়েল ঢোনজয়, হামি তোমার বংগালী লোকের ফলার ভক্ষণ ডর্শন কোরিবে - ইহা আমার ডীরগ কালের খোস। টুমি জয়গডঢার্টির পূজায় টোমার বরামহন লোকের ফলার ভক্ষণ আমার চকসুর সন্মুখে ষ্টাপন করো। হামার কথা টুমি বুঝিতে পারিলো?" 


নায়েব বলিলেন, " হাঁ হুজুর, আমার চণ্ডীমণ্ডপের সামনে সামিয়ানার নীচে ব্রাহ্মণভোজনের স্থান হবে। কিন্তু সেখানে তো আপনার যাওয়ার ব্যবস্থা করতে পারবো না। তবে আপনি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে দেখতে পারবেন।"


সিভিল সাহেব এই প্রস্তাবেই সম্মত হইলেন। গ্রামস্থ ব্রাহ্মণরা শ্রেণীবদ্ধ ভাবে বসিয়া পদ্মের পাতায় লুচির ফলার করিলেন। সাহেব তাঁহার ঘোড়া হইতে নামিয়া দেউড়ির নিকট দাঁড়াইয়া ব্রাহ্মণ ভোজন দেখিলেন। কিন্তু দেখিয়া খুশি হইতে পারিলেন না। 


তিনি নায়েবকে ডাকিয়া জানাইলেন, 'বংগালী লোক' ফলার করিবার সময় মুখ হইতে 'গপ - গপ', 'হাপুস - হুপুস' শব্দ উচ্চারণ করে। একথা শুনিয়াই তিনি ব্রাহ্মণ ভোজন দেখিতে আসিয়াছিলেন। কিন্তু তাহা তিনি দেখিতে পাইলেন না। ইহার কারণ কি?


ধনঞ্জয় নায়েব মাথা চুলকাইয়া ভাবিতে লাগিলেন। তাহার পর বলিলেন, " ব্রাহ্মণরা লুচির ফলার করিলেন। উহাকে পাকা ফলার বলে। পাকা ফলারে ঐরূপ শব্দ হয়না। যাহারা কাঁচা ফলার করে, অর্থাৎ দৈ দিয়া চিঁড়া মুড়কি মাখিয়া আহার করে, তাহাদের মুখ হইতে আহার কালে ঐরূপ শব্দ হয়। কিন্তু উহা সাধারণ লোকের ফলার। সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের নিমন্ত্রণ করিয়া তাঁহাদিগকে চিঁড়া দৈ খাইতে দেওয়া যায়না। ভদ্রলোকরা কাঁচা ফলার খাইতে আসেন না।


সাহেব চিঁড়া দৈ এর ফলার দেখিবার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করিয়া পর দিনই ঐরূপ ফলারের আয়োজন করিতে বলিলেন। নায়েব জানাইলেন, এজন্য পূর্ব্ব হইতে যোগাড় করিতে হয়। চিঁড়া কুটাইতে হয়, গয়লা বাড়ি দধির বরাত দিতে হয়। কিন্তু প্রতিমার বিসর্জ্জনের পর পূজা উপলক্ষে নিমন্ত্রণ করা নিয়ম বিরুদ্ধ।


সাহেবের ধারণা হইল, পুনর্ব্বার অর্থব্যয়ের আশঙ্কায় নায়েবের এইরূপ আপত্তি। এজন্য তিনি নায়েবকে জানাইলেন, নায়েব গ্রামের জনসাধারণকে নিমন্ত্রণ করিয়া তাহাদিগকে চিঁড়া দৈ এর ফলার দিবেন। সাহেব তাহা দেখিবেন এবং সেজন্য যে টাকা নায়েবকে ব্যয় করিতে হইবে, তিনি স্বয়ং সেই ব্যয়ভার বহন করিবেন।


নায়েব একটা উপায় স্থির করিলেন। কয়েক দিন পরে তাঁহার মাতার বার্ষিক শ্রাদ্ধ ছিল। সেই দিন তিনি গ্রামস্থ জনসাধারণকে নিমন্ত্রণ করিয়া, চিঁড়া, মুড়কি, রাশি দৈ ও আকের গুড় দিয়া ফলার করাইলেন।


সাহেব দেখিলেন, আহারের সময় তাঁহাদের মুখে 'হাপুস-হুপুস' শব্দ হইতেছে। দেখিয়া সাহেব খুশি হইয়া বলিলেন, " নায়েব, টোমার এই কাঁচা ফলার আচ্ছা আছে। পাকা ফলার কুছ কামকা নেহি। "


এই শ্রেণীর ইংরেজ একালে আর দেখিতে পাওয়া যায় না। ঐ সকল ইংরেজের সদাশয়তার গল্পও একালে প্রবাদ বাক্যে পরিণত হইয়াছে।


কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ


সংসদ বাঙ্গালী চরিতাভিধান 

মাসিক বসুমতী পত্রিকা

0 Comments:

Post a Comment

Subscribe to Post Comments [Atom]

<< Home