বীভৎস রসের গল্প - কবরখেকো
(যারা সাহিত্য চর্চা করেন তারা জানেন যে বীভৎস রসও সাহিত্যের অন্যতম রস। কিন্তু আজকাল বীভৎস রসের গল্প প্রায় চোখেই পড়েনা। যা দুচারটে লেখা হয় তা নিতান্তই এলে বেলে লেখা।
এই ধরণের গল্পের পাঠক সংখ্যা বরাবরই কম। বিশেষ করে মহিলা মহল এই ধরণের গল্প পছন্দ করেন না।
আমি এই পোস্টে বীভৎস রসের একটি গল্প আপনাদের সাথে ভাগ করে নিলাম। গল্পটি পেয়েছি বন্ধুবর দেবাশীষ কমলকৃষ্ণ গোস্বামী র গ্রুপ " ওরা আসছে " থেকে।
গল্পটির লেখক হলেন বাংলাদেশের মহম্মদ পারভেজ মুন্না।
যারা গল্পটি পড়বেন ভাবছেন তাদের অন্তত কিছুটা স্নায়ুর জোর থাকতে হবে ও ঘেন্না ঘেন্না ভাব থাকলে চলবে না।
এই গল্পটি নিঃসন্দেহে আমার এখন অব্দি পড়া শ্রেষ্ঠ বাংলা বীভৎস রসের গল্প)
কবর খেকো
লেখকঃ মহম্মদ পারভেজ মুন্না
মোটর বাইকটা ঘ্যাচ করে থানার সামনে এসে ব্রেক করে সাব ইনেসপেক্টর রফিক। বিরক্ত মুখে বাইকের চাবি হাতে নিয়ে থানার মধ্যে ঢোকে। দুই রুমের এই একতলা দালানের সামনের রুমে রফিক, এক হাবিলদার আর তিন সেপাই এর বসার জায়গা। রুমের এক পাশে মোটা গরাদ দিয়ে আসামীদের রাখার বাবস্থা করা হয়েছে। আর পিছনের ছোট্ট তালা বন্ধ রুমে হচ্ছে থানার অস্ত্রাগার।
মেজাজটা সকাল থেকেই খিঁচড়ে আছে রফিকের। শালার এই অজ গন্ডগ্রামে বদলি হবার পর থেকেই যখনই থানায় ঢোকে তখনই এমন হয়। এখানে না আছে কোনো উপরির সুযোগ, না আছে উন্নতির আশা। কিন্তু কি আর করা। সদ্য পুলিশের চাকরিতে ঢুকেছে ও। প্রথম দিকে বড় কর্তারা এমন ফালতু জায়গায়ই পোস্টিং দেবে। তবুও মেজাজটা প্রায়ই খারাপ থাকে রফিকের। এই চাকরিতে ও ঢুকেছেই মাল কামানের আশায়। কিন্তু এই প্রতাপপুরের মত ছোট্ট থানায় সে সুযোগ নেই বললেই চলে।
মাথার ক্যাপটা খুলে হতাশ ভঙ্গিতে নিজের ডেস্কের পিছনের চেয়ারে বসে রফিক। কোমরের বেল্টটা একটু ঢিলা করে গলা ছেড়ে ডাক দেয় হাবিলদার নজরুলকে। ব্যাটা নিশ্চই থানার পিছনে বসে বিড়ি টানছে। সেপাই তিন জন আছে টহলে। চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করেই আবার ডাক দেয় রফিক
" আই নজরুল, কোথায় তুমি? "
বাইরে দ্রুত বুটের শব্দ শোনা যায়। চোখ খুলে সামনে এটেনশন রত অবস্থায় নিজের হাবিলদারকে দেখতে পায় রফিক।
" কী এতক্ষন কোন চুলায় ছিলা? "
" আর কইয়েন না স্যার, এক হালারে আইজ বাইন্দা আনছি। হালায় বড়ই আজিব কিসিমের। "
"তা তার অপরাধটা কী? মুরগী চুরি না বদনা চুরি? তোমাগো এই চুতিয়া জায়গায় এর চেয়ে আর কী বেশি অপরাধ হবে। শালার চাকরি!"
নিজের মনের ক্ষোভটা ঢাকতে পারেনা রফিক।
মাল আমদানি হয় এমন অন্য কোনো থানায় পোস্টিং পেলে এতদিনে বেশ কিছু মালপানি জমাতে পারতো। কিন্তু এই ঠাডা পড়া থানায় না আসে কোনো বড় কেস, আর তাই মাল আমদানির না আসে কোনো সুযোগ। যদি ধারে কাছে বর্ডার থাকতো তাহলেও না হয় কিছু চোরা চালানি ধরে মাল কামানো যেত। কিন্তু সে আশায় গুড়ে গু। এই ক্ষয়রাতি গ্রামের লোকেদের না আছে কোনো টাকা পয়সা, আর না আছে কোনো বড় অপরাধ করার ইচ্ছা। শালারা সব ম্যান্দামারা পাবলিক।
" না স্যার তা না, এই হালায় চুরি মুরি করে না। তয় গ্রামের মানুষ গুলারে জ্বালাইয়া খাইতাছে। "
" মানে কী? কী করে শালায়?
হাবিলদার নজরুল নিজের শুকনো কোমর থেকে
ঢলঢলে প্রায় নেমে যাওয়া প্যান্টটা এক হাতে টেনে ধরে, মাথাটা কিছুটা সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে ফিসফিস করে বলে-
" হালায় স্যার কব্বরের মাডি খায়। "
" কবরের মাটি খায় মানে? কোন পাগল ছাগল ধরে এনেছো? "
বিরক্ত ভাব চরমে ওঠে রফিকের।
" না স্যার, সত্যি কতা, হালায় নুতন কব্বর পাইলেই হ্যার মাডি গুলা খামচাইয়া খামচাইয়ে খায়। কব্বর দিয়া সবে চইল্লা গেলেই হালায় আইয়া জোডে। মাডি মুডি খাইয়া কব্বরের বাঁশ, মাশ কলাপাতা সব বাইর কইরা ফ্যালে। হালারে এত ধাবরাইছে গেরামের সবে মিল্লা হ্যা কইয়েন না। কিন্তুক হালায় জানি কোন হানে পলাইয়া থাহে। আইজ হালারে দেহি থানার সামনে উক্কি ঝুক্কি মারতে আছে। আর কী আশ্চাইর্য স্যার!! যে বাড়ি মানুষ মরবে হেই বাড়ির আইশ পাশে মানু মরার দুই এক দিন আগে থাকতেই পলাইয়া পলাইয়া ঘোরতে থাহে। এ এক আচানক ব্যাপার স্যার। বড়ই আচানক। হালায় ট্যার পায় ক্যামনে আল্লা মাবুদ জানে। "
এতক্ষন ধৈর্য ধরে হাবিলদারের প্যাচাল শুনছিল রফিক। কিন্তু এবার আর ধমক না দিয়ে পারে না।
" কী সব ঘোড়ার ডিম বলতেছো? কই চল দেখি কোথায় তোমার সেই কব্বরের মাটি খাওয়া পাগল। "
রফিকের ধমকে কিছুটা মিয়িয়ে যায় হাবিলদার নজরুল। মনে করেছিল এই কাহিনী বলে স্যারের বাহবা পাবে, এমন এক আসামি ধরার জন্য মাথা নিচু করে মিনমিন করে বলে-
" হালারে থানার পিছনে আমনের কোয়াটারের
সামনে আম গাছটার লগে বাইন্ধা থুইছি।"
" তাতে আমার চৌদ্দ গুষ্ঠি উদ্ধার করছো। কেন শালারে গরাদে ঢুকাও নাই কেন?
মাথা চুলকে নজরুল বলে-
" কেমুন জানি ভয় লাগতেছিল স্যার। হের লাইগা থানায় ঢুকাইন্যার সাহস পাই নাই।"
" আচ্ছা চল দেখি কোথায় তোমার কবরখেকো পাবলিক।"
নিজের হাবিলদারকে নিয়ে থানার পিছন দিকে তার থাকার কোয়াটারের দিকে যায় রফিক। ওর ছোট্ট টিনশেড কোয়াটারের ঠিক সামনে এক বিশাল আম গাছ। সেটার সাথেই পিছনে হাত বাঁধা এক যুবককে দেখতে পায় ও। পরনে শুধু ময়লা লুঙ্গি। খালি গা। আর সে গায়ের রঙ কুচকুচে কালো। মাথায় মাটি, ধুলো মাখা লালচে একরাশ বাবরী চুল। মাথাটা নিচু করা। মনে হয় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই ঘুমাচ্ছে। পরনের লুঙ্গি প্রায় খুলে যায় যায় অবস্থা।
প্রচণ্ড ভাবে ধমকে ওঠে হাবিলদার নজরুল-
" ঐ বান্দর লুঙ্গি বান ঠিক মত, স্যারে খাড়াইয়া রইছে সামনে দ্যাহোছ না।"
আস্তে করে নজরুলের দিকে তাকায় রফিক।
" মাথায় যেটুকু বুদ্ধি ছিল তা কি বেচে দিয়েছো বিড়ি খাবার টাকার আশায়? আহাম্মক, ওর হাতের বাঁধন খোল। হাত বাঁধা অবস্থা লুঙ্গি ঠিক কবে কেমনে ও।"
" ও হ স্যার ঠিকই কইছেন "
দৌড়ে গিয়ে যুবকের হাতের বাঁধন খুলে দেয় নজরুল। সাথে সাথে ধপাস করে জায়গাতেই বসে পড়ে যুবকটি। এবার মাথা তুলে ধীরে ধীরে তাকায় রফিকের দিকে। তার ঈষৎ লালচে চোখের দিকে তাকিয়ে রফিক ভাবে " আরে এতো বলতে গেলে এক কিশোর।" শুধু গায় পায়ে একটু বড়। তবে প্রচণ্ড শুকনো। পাঁজরের হাড়গুলো প্রায় গোনা যায়। চোখে কেমন ঘোর লাগা দৃষ্টি। হঠাৎ কেমন যেন মায়া হয় ছেলেটার উপর রফিকের। ব্যাটা কয়দিন খেতে পায়নি কে জানে! দেখেই বোঝা যাচ্ছে এ পুরা পাগল। গ্রামের মানুষদের কাছ থেকে খাবার না পেয়ে হয়তো ক্ষুধার জ্বালায় মাটি, কাঁচা গাছ পালা এসব খাচ্ছে আর তাই নিয়ে গ্রামে এত হইচই।
ছেলেটার সামনে গিয়ে দাঁড়ায় রফিক। রফিককে কাছে আসতে দেখেই আবার ছেলেটা মাথা নিচু করে
" কিরে তোর নাম কী?"
মাথা নিচু করেই উত্তর দেয় ছেলেটা-
" ইয়াদ নাই। "
"থাকো কোথায়?"
" ইয়াদ নাই"
" বাপ মা আছে? "
" ইয়াদ নাই। "
" তোর সবই ইয়াদ নাই। তা এই গ্রামে আছো কয়দিন? "
মাথা নিচু করে হাসে ছেলেটা, কিন্তু কোনো উত্তর দেয় না।হাবিলদারের দিকে ফেরে রফিক -
"ওরে কোয়াটারের বারান্দায় নিয়ে এসো"
ছেলেটার হাত ধরে একটানে দাঁড় করিয়ে প্রায় টানতে টানতে কোয়াটারের বারান্দায় এনে মেঝেতে বসায় হাবিলদার নজরুল। ছেলেটা এরই ফাঁকে কোনো মতে লুঙ্গিতে ভালোমত গিঁট দিয়ে নেয়। রফিক এসে বারান্দায় রাখা ওর আরাম কেদারাটায় বসে। ছেলেটার নিচু মুখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে-
" কিরে তুই নাকি কবরে মাটি খাস? আবার মানুষ মরার আগে তার বাড়ির কাছে ঘুরতে থাকস? ঘটনা কী? ঠিক মত জবাব দে। নইলে টানাইয়া পিটামূ। পুলিশ কী জিনিস তা জানস?"
মাথাটা নিচুই থাকে। কোনো উত্তরও আসে না।
হাবিলদার নজরুলের আর ধৈর্য হয় না।
"স্যার হালারে আগে কতক্ষুন পিডাইয়া লই, হ্যার পর জিগামু আনি যা জিগানের। কী কন?"
" চোপ, কোনো কথা বলবা না। "
রফিকের ধমকে আবারো মিয়িয়ে যায় নজরুল।
" না স্যার মানে কইছিলাম... "
"আবার কথা বলো, একদম চুপ।"
কিছুক্ষন ছেলেটার দিকে চেয়ে ভাবতে থাকে রফিক। তারপর বলে-
" এই তুই কাজ করবি এখানে? আমার কোয়াটারে থাকবি, ঝারু মারু দিবি, পয় পরিস্কার করবি, কি ঠিক আছে?"
এবার মাথা তুলে নিজের নোঙরা মাটি মাখা দাঁতগুলো বের করে হাসে ছেলেটা। কোনো কথা বলে না। তবে হাসিতে সম্মতির লক্ষণ। ওর হালকা লাল ঠোঁটের ফাঁকে কালো মাটি মাখা দাঁত গুলো দেখে কিছুটা চমকে যায় রফিক। অসস্তি কাটানোর জন্য নজরুলকে বলে-
" ওকে কিছু খেতে দাও।"
নজরুল আর সহ্য করতে পারে না। ওর ধারণা ছিল স্যারে আগে একলাছা মাইর দিতে বলবে, বহুদিন আউশ মত কাউরে মাইর দেয়া হয় নাই। এই চান্সে হাতের চুলকানি কিছুটা কমবে। তা না স্যারে হালারে জামাই আদর করতাছে।
"স্যার খাওন দেয়ার আগে এট্টু মাইর দিয়ে লইলে ভালো হইতে না?
ঠাণ্ডা চোখে নিজের হাবিলদারের দিকে তাকায় রফিক-
"আর একটা কথা বললে মাইর তোমার পিছন দিক দিয়ে ঢুকাইয়া দেব। এক মাস "মলত্যাগ" বাদ দিয়া বিছনায় উপুর হুয়ে শুয়ে থাকবে। বুঝছো আমার কথা? এখন যাও দেখো ঘরে খাবার কি পাওয়া যায়, সেগুলো এনে দাও ওকে।
মলিন মুখে কোয়াটারের ভিতরে যায় নজরুল।
মাথা নিচু ছেলেটাকে আবার প্রশ্ন করে রফিক-
" আচ্ছা তুই মানুষ মরার আগেই বুঝছ কেমনে যে ঐ বাড়িতেই মানুষ মরবে? তুই নিজেই কি মারো নাকি বিষ টিষ খাইয়ে? "
এবার সরাসরি রফিকের চোখে তার লাল ঘোলাটে চোখ রাখে ছেলেটা।
" না সাব, আমি ঘেরান পাই, আহারে কি সুন্দার ঘেরান। যে বাড়ী মানু মরবে হেই বাড়ীর থনে ঘেরান বাইর হয়, আর কব্বরে লাশ রাখনের পর ঘেরানে আমি পাগল হইয়া যাই। কী স্বাদ কব্বরে মাডির। কী মজা লাগে হেই মাডি খাইতে।"
নিজের স্পাইনাল কর্ডে এক ঠাণ্ডা শীতল অনুভুতি টের পায় রফিক। কী যেন একটা অস্বাভাবিক কিছু আছে ছেলেটার চোখে আর কণ্ঠস্বরে। বুকের মধ্যের অসস্তিটা আবার ফিরে আসে। ভাবে, "না এই শালাকে রাখা যাবে না। বিনা পয়সার চাকরের দরকার নেই। দ্রুত বিদায় করতে হবে।" এমন সময় হাবিলদার নজরুল এক বাটি মুড়ি আর আরেক বাটিতে খান কয়েক গরম জিলাপি নিয়ে এসে ছেলেটার সামনে ফ্যালে।
"নে খা হারামজাদা, প্যাট ভইরা খা"
মাইর দিতে না পারায় তার মনে গভীর "দু:খ"।
কিন্তু বাটিগুলোর দিকে ফিরেও তাকায় না ছেলেটা।এক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে রফিকের দিকে।
সে দৃষ্টি ঘোর লাগা দৃষ্টি, সে দৃষ্টি শীতল দৃষ্টি।
সে দৃষ্টিতে বুকের গভীরে আতঙ্ক টের পায় রফিক। ধমকে ওঠে-
"কী খাচ্ছিস না কেন? খা তারাতারি।"
কিন্তু কোনো কথা না বলে মুচকি হাসে ছেলেটা। দৃষ্টি থমকে থাকে রফিকের উপরই। যেন কোনো ক্ষুদার্থ কুকুর চেয়ে আছে কাঁচা মাংসের দিকে।
আর সহ্য হয় না সাব ইনেসপেক্টর রফিকের। হাবিলদার নজরুল কে আদেশ দিয়ে বলে-
" এই হারামজাদাকে এখনই কয়েকটা চড় থাপ্পর দিয়ে থানা কম্পাউন্ডের বাইরে অনেক দূরে ফেলে দিয়ে আস। আর এই সব আউল ফাউল ঝামেলা যেন আর থানায় আনতে না দেখি।"
এতক্ষনে মনের মত কাজ পেয়ে অতি উৎসাহে ছেলেটার ঘাড় ধরে টেনে হিচড়ে, পাছায় গোটা কয়েক লাথি মেরে নিয়ে যেতে থাকে নজরুল।
পকেট থেকে রুমাল বের করে মাথার বিন্দু বিন্দু ঘাম মোছে রফিক। কেমন যেন হয়ে গিয়েছিল ও।
নার্ভাস ভঙ্গিতে একটু হাসে। শালা!! কত রকমের পাবিলিকই যে আছে দুনিয়ায়। বুকের আতঙ্কটা চাপা দিতে চায় একটা সিগারেট ধরিয়ে।
এদিকে হাবিলদার নজরুল থানা থেকে বেশ কিছুটা দূরে এসে এক খালের পারে এনে ছেলেটাকে শেষ এক লাথি মেরে ফেলে দেয় খালে। নিজের কাজে সে যথেষ্ট সন্তষ্ট।
যদি নজরুল লাথি, কিল, ঘুষি মারার উত্তেজনায় না থাকতো তবে শুনতে পেত পুরোটা পথ ছেলেটা বিড়বিড় করে শুধু একটা কথাই বলেছে-
"আহারে কী সুন্দার ঘেরান, সাবের শরিল দিয়া কী সুন্দার ঘেরান। আহারে কী সোয়াদ।"
রাত দশটার একটু বেশি হবে। গ্রাম্য অঞ্চলে দশটাই অনেক রাত। গ্রামের মূল কাঁচা রাস্তা ধরে বাইক চালিয়ে কিমি দশেক দূরের উপজেলা শহরের দিকে যাচ্ছে রফিক। আজ উপজেলার এক মেম্বার দাওয়াত দিয়েছে একটু ফুর্তি ফার্তার। ভুরিভোজ ডিনারের পর হালকা বিদেশী লাল পানির ব্যাবস্থা আছে। আছে একটু নারী মাংসেরও ব্যাবস্থা। আশেপাশের থানার দায়িত্ব প্রাপ্ত সাব ইনেসপেক্টরদের খুশী রাখতে মাঝে মাঝে এই রকম একটু ফুর্তির ব্যাবস্থা করতেই হয় স্থানীয় মেম্বারদের। এতে তাদের অনেক জটিল সমস্যার সমাধান খুব আছানেই হয়ে যায়। সারাদিন বসে বসে মাছি মারা চাকরী এর পর এখন মনটা হালকা মেজাজেই আছে রফিকের আসন্ন "ফুর্তির" কথা ভেবে। বাইকের স্পিড নিজের অজান্তেই বাড়িয়ে দেয় ও। গ্রামের কাঁচা রাস্তা গিয়ে মিশেছে উপজেলার দিকে যাওয়া পিচের রাস্তার সাথে। রাস্তার বাঁক ঘুরে শুনশান পিচের রাস্তায় উঠেই বাইকে প্রচণ্ড গতি তোলে রফিক। ঠিক তখনই কালো পিচের রাস্তার একদম মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কবরখেকো ছেলেটাকে। বাইকের হেড লাইটের উজ্জল আলোয় কালো কুচকুচে দেহ এবং ময়লা দাঁতগুলো যেন রফিকের বুকে কাঁপন ধরিয়ে দেয়। শরীরের দু'পাশে দু’হাত লম্বা করে দাঁত বের করে হাসছে কবরখেকো। যেন এখনই জড়িয়ে ধরবে রফিককে। বাইকের সাথে ধাক্কা লাগলো বলে। ভয়ংকর দেহটাকে কোনোমতে এড়াতে চায় রফিক। কিন্তু এত গতিতে চলা বাইকে বসে তা আর হয়ে ওঠে না। তাল হারিয়ে প্রচণ্ড বেগে বাইক নিয়ে আছড়ে পড়ে রফিক রাস্তার পাশের এক বিশাল গাছের উপর। মুহূর্তেই মোটর বাইক আর রফিকের মাংসল দেহ ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যায়। এক ঝলক লাল রক্ত ছিটকে পড়ে রাস্তায় আর পাশের সবুজ ঘাসে। বাইকের ইঞ্জিন বন্ধ হতেই নিঃস্তব্ধতা নেমে আসে নির্জন রাস্তায়। ব্যাটারির কারণে জ্বলতে থাকা হেড লাইটের আলোয় জীবনের শেষ মুহূর্তে রফিক দেখতে পায় এক কালো কুচকুচে মুখমণ্ডল। যাকে ঘিরে রেখেছে বাবরি চুলের গোছা। রফিকের কানে ভেসে আছে সেই মুখের ময়লা মাটি মাখানো দাঁতের ফাঁক দিয়ে বের হওয়া শব্দগুলো
"আহারে কী সুন্দার ঘেরান। কী সুন্দার সোয়াদ।"
তারপরই চিরকালের জন্য সব অন্ধকার।
গ্রামের এক কোনে প্রাচীন কবরস্থানে সদ্য খোঁড়া কবরে সাব ইনেসপেক্টর রফিকের প্রায় ভর্তা হয়ে যাওয়া লাশ রাখতে রাখতে হাবিলদার নজরুল কাঁদতে থাকে। ভাবে,
"স্যারে শ্যাষ কালে এইভাবে মরলে। ওনার কবরও হইলো কিনা এই গেরামে। কপালের লিখন খণ্ডায় কেডা?"
কবর দেয়া শেষ হতেই গ্রামের এক মুসুল্লি যে জানাজা দিয়ে রফিকের লাশ দাফন দিয়েছে এবং নজরুল সহ আর দু-চার জন যারা এসেছিল তারা ধীরে ধীরে চলে যায়। থাকে শুধু স্তব্ধ নীরবতা।
গভীর ঘনঘোর কালো রাত। প্রাচীন কবরস্থানের গাঢ় ঝোপঝাড়গুলোয় যেন অন্ধকার জমাট বেঁধে রয়েছে। রাত জাগা শেয়ালের দল কবরস্থানের আশেপাশে ঘুর ঘুর করছে আর আকাশের তারার দিকে চেয়ে করুন সুরে "হু হু" করে ডাকছে পুরোনো কবরগুলোর ফাঁক ফোকোর দিয়ে যদি দ-ুএকটা হাড় বের করে এনে চিবুনো যায় তার আশায়। কিন্তু আজ ওরা কবরস্থানের মধ্যে ঢুকতে সাহস পাচ্ছে না। কী যেন এক অশুভ কিছুর ভয়ে! রাতের বাতাসও যেন স্থির হয়ে আছে। সমস্ত পরিবেশে কিসের যেন জল্পনা কল্পনা। হঠাৎ এক ঝোপের মধ্য থেকে উলটো হয়ে চার হাত পায়ে কিছু একটা দ্রুত ছুটে যায় রফিকের কবরের কাছে। কবরের মাথার কাছে এসে বসে শীর্ণ দুহাতের তীক্ষ্ণ নখগুলো দিয়ে খাবলিয়ে খাবলিয়ে মাটি খেতে থাকে গোগ্রাসে। কয়েক লহমাতেই কবরের মাথার দিকের প্রায় সব মাটি খেয়ে ফেলে সে। এবার দু'হাতে টান দিয়ে কবরের বাঁশ চাটাই সব তুলে ফেলে। কাফনে জড়ানো রফিকের মাথার দিকে লোভাতুর দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে কয়েক সেকেন্ড। তারপর আস্তে করে কাফন সরিয়ে রফিকের লাশের মাথা উন্মুক্ত করে এক ভারী ইট দিয়ে বাড়ী দিয়ে ভাঙ্গতে থাকে মাথার খুলি। দু-একটা প্রচন্ড বাড়ীতে ফাটিয়ে ফেলে খুলিটা। জান্তব এক আওয়াজ করে এবার খুলির হাড়গুলো নিয়ে মহানন্দে চুষতে থাকে। পুরো খুলির উপরিভাগ উন্মুক্ত হতেই দু'হাতে গপগপ করে খেতে থাকে রফিকের তাজা মগজ। তৃপ্তির সাথে শেষ করে খাওয়া। তারপর আশেপাশের মাটি দিয়ে আবার ঢেকে দেয় কবরটা। মুখ তুলে অন্ধকার আকাশের দিকে চেয়ে সুর তোলে গলায় "হু হু"। ঠিক শেয়ালগুলোর মত! এই গ্রামের মানুষরা জানে না যাকে তারা কবর খেকো বলে সে আসলে মগজ খেকো। সে আসলে অন্য কিছু। মৃত্যুর গন্ধ পায় সে। তাই ঘোরাফেরা করে যে মানুষ মরবে তার আশেপশে।
আকাশের দিকে চেয়ে ডাক শেষ হতেই আবার চার হাত পায়ে ফিরে চলে সে। মুখে অস্পষ্ট ফিসফিসানি-
"আহারে কী সুন্দার ঘেরান, আহারে কী সুন্দার সোয়াদ।"


0 Comments:
Post a Comment
Subscribe to Post Comments [Atom]
<< Home