পীর বাদশাহ
পীর বাদশাহ
(৪)
যথা সময়ে গুপ্তচর নারনৌলের ভারপ্রাপ্ত শিকদারের কানে এই ঘটনার বিস্তৃত বিবরণ তুলে দিল।
এই খবর শুনে শিকদার চেঁচিয়ে উঠল রেগে আগুন হয়ে, " এই ন্যাড়া কাফেরদের সাহস দিন দিন বেড়ে উঠছে দেখছি। শাহী পেয়াদার গায়ে হাত তোলে এরা। এত হিম্মত এদের।"
" হুজুর, আশে পাশের সব গ্রামের সতনামীরা এসে নারনৌলের কাছে এক কাট্টা হচ্ছে। হুজুর, গুস্তাখি মাফ করুন, এর হয়তো বাগাওয়াত (বিদ্রোহ) করতে পারে।"
" খবরদার, নিজের জবান কে লাগাম দাও গুস্তাখ। ইনশাল্লাহ! বাদশাহ সালামতের বিরুদ্ধে বাগাওয়াত করবে এই কাফেররা। খোয়াব দেখছো নাকি তুমি।"
" হুজুর আমি আপনার নমক হালাল গোলাম। মাফি দিয়ে দিন।"
" হুঁ, মাফ কিয়া। তুমি যাও এখন। ওই ন্যাড়াদের উপর তীক্ষ্ণ নজর রাখ। আমি ভেবে দেখি কি করা যায়। বাগীদের তালিম কি ভাবে দিতে হয় তা আমার জানা আছে।"
পরে একটু ঠাণ্ডা হয়ে শিকদার ভেবে দেখে যে তার বহুদিনের পুরানো গুপ্তচর তাকে ভুল খবর দেবে না। ওই ন্যাড়া কাফেরগুলো হয়তো সত্যিই বাদশাহ সালামতের বিরুদ্ধে বাগাওয়াতের ধান্দা করছে। ওই কাফেরগুলোকে যদি ভালো রকম শিক্ষা দেওয়া যায়, তাহলে বাদশাহের সুনজরে পড়ার একটা সুযোগ পাওয়া যাবে। চাই কি একটা সর্দারি বা মনসবদারি পাওয়াও অসম্ভব নয়। বাদশাহ খুশি হলে কিনা হতে পারে।
এইসব ভেবে শিকদার পরদিনই নিজের অধীনস্থ একদল শাহী সিপাহিকে সতনামীদের শায়েস্তা করতে পাঠিয়ে দেয়।
ওদিকে নারনৌলের কাছের একটা মাঠে, আশে পাশের গ্রামের বেশ কিছু সতনামী জড়ো হয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ কি হওয়া উচিৎ, তাই নিয়ে আলাপ আলোচনা চালাচ্ছিল। শাহী সিপাহিদের আসার খবর পেয়ে তারা প্রতিরোধ করার জন্য প্রস্তূত হয়।
শাহী সিপাহিরা কিছু বুঝতে পারার আগেই সতনামীরা তাদের চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। সতনামীরা যে অস্ত্র চালনায় এত দক্ষ তা এই সিপাহিরা বা তাদের উপরওয়ালা শিকদার স্বপ্নেও ভাবেনি। তাই কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখা যায় যে শাহী সিপাহিদের প্রাণহীন দেহগুলো মাঠের মধ্যে ইতস্তত পড়ে আছে।
শাহী সৈনিকদের এই দুর্দশার খবর দাবানলের মত নারনৌল ও তার আশে পাশে ছড়িয়ে পড়ে। বিপদ বুঝে শিকদার দ্রুতগামী অশ্বে নিজের দূতকে দিল্লির দিকে রওনা করে দেয়।
(৫)
ওদিকে সতনামীরাও এবার খোলাখুলি বাদশাহ ঔরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। খবর পেয়ে দূর দুরান্তের সতনামীরা অস্ত্র শস্ত্র সহ সবাই এসে নারনৌলে জড়ো হতে থাকে। তবে একটা মুশকিল দেখা দেয়। সতনামীদের প্রধান নেতা কে হবে তা তারা ঠিক করে উঠতে পারে না।
এমন সময় হঠাৎ সতনামীদের জমায়েতের কাছে আবির্ভাব হয় এক বৃদ্ধার। তিনি কে ছিলেন বা তার নাম কি ছিল ইতিহাসে তা লেখা নেই।
তবে বর্তমানের ম্যানেজমেন্ট শাস্ত্রে যাকে বলা হয় মোটিভেশন বা ম্যান ম্যানেজমেন্ট, তাতে যে এই বৃদ্ধা পারদর্শী ছিলেন, তা তার পরবর্তী কার্য্যকলাপ দেখে স্পষ্ট বোঝা যায়।
বৃদ্ধা দৃপ্ত ভঙ্গীতে সতনামীদের সামনে এসে দাঁড়ালেন। তারপর ওজস্বী এবং আবেগপূর্ণ ভাষায় তাদের সম্বোধন করে বলতে থাকেন, " হে আমার সতনামী পুত্রেরা, তোমরা সব সময়য় নিজেদের নামের অনুরূপ সত্য জীবন যাপন করেছ। জ্ঞানত: কারুর উপর কখনো অত্যাচার করনি। অন্যায় করনি। অন্যায় ভাবে কারুর থেকে কিছু অপহরণ করনি। নিজেরা উপবাসে থেকেছ। স্ত্রী পুত্র কন্যাকে উপবাসে রেখেছ। তবুও লোভের পথে কখনো পা বাড়াও নি। সত্যিকারের সন্ন্যাসী তো তোমরাই। এই গৈরিক বস্ত্রের সত্যিকারের আধিকারি তো তোমরাই। আর সত্যিকারের সন্ন্যাসীরা কখনো অন্যায় সহ্য করে না। তোমাদেরও বাদশাহের অন্যায় অত্যাচার অবিচার সহ্য করা উচিৎ নয়....."
বৃদ্ধার তেজোদৃপ্ত বক্তৃতা সতনামীরা একমনে শুনতে থাকে। নিজের বক্তৃতার প্রভাব সতনামীদের উপর পড়ছে লক্ষ্য করে বৃদ্ধা আবেগপূর্ণ স্বরে বলে চলেন, " হে আমার বীর পুত্ররা আমার দিকে দেখ। আমি বয়স্কা বৃদ্ধা। তবুও আমি তোমাদের কাছে এসেছি। নিজের পুত্রদের বিপদের দিনে আমি তাদের পাশে থাকতে চাই। আর হ্যাঁ, আমাকে তোমরা সাধারণ একজন বৃদ্ধা মহিলা মনে করোনা। আমি মন্ত্র জানি। যুদ্ধে কোন কারনে তোমাদের কারো স্বর্গলাভ হলে তার জায়গায় তৎক্ষণাৎ আরো পঞ্চাশ জন সতনামী উঠে দাঁড়াবে। হা: হা: হা: ঔরঙ্গজেব, এবার তুই দেখবি আমার মন্ত্রের জোর।" এই বলে বৃদ্ধা বিকট শব্দে হেসে ওঠেন।
প্রচণ্ড উৎসাহে সতনামীরা একযোগে সেই বৃদ্ধার উদ্দেশ্যে জয়ধ্বনি দিতে থাকে এবং সেই বৃদ্ধাকেই নিজেদের প্রধান নেতা বলে মেনে নেয়।
(৬)
এবার সতনামীদের দমন করতে এলেন তাহির খাঁ। দিল্লি থেকে পাওয়া আদেশ অনুসারে নারনৌলের ফৌজদার তাহির খাঁ বেশ বড় একদল সৈন্য নিয়ে সতনামীদের মুখোমুখি হলেন।
কিন্তু উৎসাহে ভরপুর সতনামীরা সেই বৃদ্ধার নেতৃত্বে বাজপাখির মত তাহির খাঁ এর সৈন্যদলের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাহির খাঁ হার স্বীকার করেন। সতনামীরা নারনৌল শহর পুরোপুরি দখল করে নেয়।
শহর দখল করেই সতনামীরা পুরো জেলার শাসন ব্যবস্থা নিজেদের হাতে নিয়ে নেয় এবং ব্যবসায়ী ও চাষিদের কাছ থেকে বিভিন্ন রকম কর আদায় করতে থাকে। শহর থেকে মুঘল শাসনের সমস্ত চিহ্ন নষ্ট করে ফেলা হয়।
এই বিদ্রোহের খবরও অচিরেই দিল্লি পৌঁছে যায়। শাহী সৈন্যদলের মধ্যে এই গুজবও ছড়িয়ে পড়ে যে সতনামীদের নেতৃত্ব করছে এমনন এক বৃদ্ধা যে কিনা যাদু মন্ত্রের প্রকাণ্ড পণ্ডিত। তার মন্ত্রের জোরে একজন সতনামী মারা গেলেই পঞ্চাশ জন তার যায়গায় উঠে দাঁড়ায়। সেই জন্যেই তো শিকদার ও ফৌজদার তাহির খাঁ এর সৈন্যদল সতনামীদের কাছে যুদ্ধে হেরে গেছে। নইলে কতগুলো গাঁওয়ার জাহিল কাফের কিভাবে রণ নিপুণ শাহী মুঘল সৈন্যদের লড়াইয়ে হারিয়ে দেয়।
তাহির খাঁ এর দুর্দশার খবর পেয়ে বাদশাহ ঔরঙ্গজেব বুঝতে পারেন যে এবার এই বিদ্রোহ দমন করার জন্য দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে। তাই তিনি সিপাহশালার রদন্দাজ খাঁকে, পনেরো হাজার মুঘল সৈনিক নিয়ে গিয়ে, অবিলম্বে বিদ্রোহ দমন করার আদেশ দেন। সঙ্গে তোপখানাও যাবে।
১৫ মার্চ ১৬৭২ সাল। রদন্দাজ খাঁ যাত্রার জন্য তৈরি সৈন্যদল নিয়ম মাফিক পরিদর্শন করে বুঝলেন যে সেই গুজবের প্রভাবে রণ নিপুণ বীর মুঘল সৈনিকরা প্রচণ্ড রকম ভীত ও উৎসাহহীন হয়ে পড়েছে।
ক্রমশ:.


0 Comments:
Post a Comment
Subscribe to Post Comments [Atom]
<< Home