Friday, January 15, 2021

সিকন্দর - অল - সানি

 


সিকন্দর - অল - সানি

(৫)

গুর্শাস্প ছিলেন সুলতানের অগ্রজ শিহাবউদ্দীন মসউদ এর পুত্র।  অল্প বয়েসে পিতৃহীন নিজের ভ্রাতুষ্পুত্রকে সুলতান তার নানা গুণের জন্য খুব স্নেহ করতেন। 

সুলতান হবার পর সুলতান  জালালউদ্দিন নিজের প্রিয় ভ্রাতুষ্পুত্রকে আমির ই তুজুক এর পদ দিলেন।

নিজের কন্যার সাথে নিকাহ তো আগেই করিয়েছিলন। 

১২৯১ সালে সুলতান নিজের প্রিয় ভ্রাতুষ্পুত্র ও জামাই আলি গুর্শাস্পকে কড়ার সুবেদার নিযুক্ত করলেন। কড়ায় রওয়ানা হবার আগে এই ব্যাপারে বেগম সাহেবাকে এত্তেলা দিতে গুর্শাস্প যখন হারেমে গেলেন  তখন বেগম সাহেবা অত্যন্ত রুক্ষ ভাবে বললেন, " আমার সঙ্গে যদি ঘর সংসার করতে হয় তাহলে দিল্লিতেই থাক। আমার পক্ষে কড়ায় যাওয়া নামুমকিন। "

" এ আপনি কি বলছেন?  আপনি আমার বেগম। শৌহর যেখানে যাবে, বেগমেরও তো শৌহরের সাথে সেখানেই যাওয়া উচিত। "

" চুপ করো। উচিত অনুচিতের তালিম আমাকে দিও না। দিল্লির সুলতানের শাহজাদী কি ভিখমাঙ্গার ঘরে যাবে নাকি। "

নিজের সম্বন্ধে বেগমের মতামত শুনে গুর্শাস্পের মুখ কাল হয়ে গেল। অনেক কষ্টে তিনি নিজেকে সামলালেন। অবরুদ্ধ গলায় বললেন, " শাহজাদী, আমার উপর, আপনার এই শৌহরের উপর,  একটু এতবার রাখুন। আর একটু ওয়াক্ত দিন। আপনার পুরো মহল আমি হীরে মোতি দিয়ে ভরে দেব।"

শাহজাদী খিলখিল করে হেসে ওঠেন, " বাজে কথা বলে আমার ওয়াক্ত যায়া করো না। তুমি কি ভাব নিজেকে। তুমি যেভাবে কথা বলছো তাতে তো মনে হচ্ছে যে দিল্লির সুলতানের শাহজাদী মাটি পাথরের ঢেলা নিয়ে খেলা করে। "

" শাহজাদী, আপনার দিল্লি সলতনতের নেশা হয়ে গেছে। বেশ আমিও ওয়াদা করছি যে সলতনতের পর সলতনত ফতেহ করে আপনার কদমে কুরবান করে দেব। "

আবার শাহজাদী ব্যঙ্গ করেন, " তুমি কড়ার একজন সাধারণ সুবেদার মাত্র। আর এই নৌকরিটাও তুমি পেয়েছ আমার আব্বা হুজুরের মেহেরবানিতে। আর সেই তুমি কিনা খোয়াব দেখছ হিন্দুস্তানের সিকন্দর ( আলেকজাণ্ডার)  হবার। তোমার দিল্লাগি শোনার ওয়াক্ত নেই আমার কাছে বুঝলে। তবে যদি দিল্লিতে থাক, তাহলে আব্বা হুজুরকে বলে আমি তোমার জন্য হয়ত কিছু করতেও পারি। "

লজ্জায় অপমানে থর থর করে কাঁপতে থাকে শরীর। নিজের রক্ত বর্ণ চক্ষু শাহজাদীর সুন্দর মুখের উপর স্থাপন করে গুর্শাস্প শীতল কণ্ঠে বলেন, " শাহজাদী, আমি আলি গুর্শাস্প, আপনার শৌহর,  আজ আপনার খিদমতে এই ওয়াদা করছি যে আপনাকে আমি একদিন সিকন্দর শাহের মত হয়েও দেখিয়ে দেব।" 

লম্বা লম্বা পা ফেলে ক্রুদ্ধ বাঘের মত হারেম থেকে বেরিয়ে আসেন গুর্শাস্প।

কড়ার দিকে অশ্বচালনা করতে করতে বার বার গুর্শাস্পের মনে ভেসে উঠতে থাকে শাহজাদীর গত দিনের অপমানগুলো। এত গুমান, এত ঘমণ্ড,  শাহজাদীর। নিজের শৌহরকে বলে কিনা ভিখমাঙ্গা। গুর্শাস্পকে ঘর জামাই হয়ে থাকতে বলে। গুর্শাস্প থুতু দেয় এই ভাবে অন্যের জি হুজুরি করে বেঁচে থাকাকে।

(৬)

কড়ায় পৌঁছে সুবেদার পদে যোগদান করেন গুর্শাস্প।কিন্তু কয়েক মাস পরেই দিল্লি ফেরত চলে আসেন। সোজা সুলতানের সামনে আর্জি রাখেন গুর্শাস্প। 

" জাঁহাপনা, আমার দিল - ই - খায়িশ এই যে আমি দিল্লি সলতনতকে খুশহাল মজবুত আর বহুত বড়া দেখতে চাই। তাই যদি আপনার ইজাজত হয় তাহলে জঙ্গের জন্য বেড়িয়ে পড়তে চাই।"

সুলতান খুশি হয়ে বলেন, " জরুর, জরুর, খুশ - আম - দিদ। তোমাকে ৮০০০ ঘোড়সওয়ার সৈনিক দিলাম। আজ থেকে তুমি এদের সিপাহসালার। আল্লাহতালা সব জঙ্গে তোমাকে ফতেহ দিন। ইসলামের পরচম (পতাকা)  তুমি সব জঙ্গে বুলন্দ কর।

পরদিনই গুর্শাস্প  ৮০০০ সওয়ার নিয়ে বেড়িয়ে পড়েন ভাগ্যান্বেষণে।

১২৯২ সালে গুর্শাস্প মালওয়া ও ভিলাসায় জঙ্গ ফতেহ করেন ও দিল্লি সলতনতের অধিকারে নিয়ে আসেন।

সুলতান খুশি হয়ে গুর্শাস্পের পদ মর্য্যাদা বাড়িয়ে দেন। কড়ার সাথে সাথে তাকে অওধ এরও সুবেদার নিযুক্ত করেন।

সেসময় দেবগিরির যাদব রাজা রামচন্দ্রদেব খুব বীর বিখ্যাত ও ধনবান রাজা ছিলেন। তার অতুল বৈভব ও সম্পদের কথা চার দিকে ছড়িয়ে পড়েছিল।

১২৯৪ সালে গুর্শাস্প দেবগিরি আক্রমণ করেন।  ঘনঘোর যুদ্ধের পরে রাজা রামাচন্দ্রদেব পরাজিত হন ও বিপুল পরিমাণ ধন রত্ন দিয়ে সন্ধি ভিক্ষা করেন। নিজের কন্যা জাথ্যাপালির বিবাহ দেন গুর্শাস্পের সাথে। 

নিজের বেগমের দ্বারা তিরস্কৃত ও অপমানিত আলি গুর্শাস্প হীরে মোতি মাণিক্য ও স্বর্ণ মুদ্রার স্তূপের মধ্যে বসে ভাবতে থাকেন নিজের ভবিষ্যত সম্বন্ধে।

কিছুদিন আগেও তিনি শাহজাদীর ভাষায়  ভিখমাঙ্গা ছিলেন। আর আজ তিনি অতুল ঐশ্বর্য্য ও লক্ষ লক্ষ স্বর্ণ মুদ্রার মালিক।

এতদিন বাদে আবার নিজের বেগমের কথা মনে পড়ে গুর্শাস্পের। কেমন আছেন এখন বেগম সাহেবা। দিল্লি ছেড়ে চলে আসার পর আর তার সাথে দেখা হয়নি।

শুধু অপমান ছাড়া আর কিছু পাননি গুর্শাস্প তার নব পরিণীতা বেগমের কাছ থেকে। তবু তারই কথা আজ বার বার মনে পড়ে পত্নী প্রেম বঞ্চিত গুর্শাস্পের।

কিছু ভেবে নিয়ে গুর্শাস্প অস্ফুটে বলে ওঠেন,  " এই শেষ নয়। এই নয় আখিরি জঙ্গ। আরো উপরে উঠতে হবে। আরো উপরে। আর  তার জন্য সব কিছুই করতে হবে। "

সব কিছু গুছিয়ে নিয়ে যাত্রা শুরু করতে করতে বেশ কয়েক মাস সময় লেগে যায় গুর্শাস্পের। তার পর আবার গুর্শাস্পের যাত্রা শুরু হয় কড়ার দিকে। পথে পড়ে এলিচপুর। সেখানেও জঙ্গ ফতেহ করেন গুর্শাস্প। এলিচপুরকেও গুর্শাস্পের অধীনতা স্বীকার করতে হয়।

(৭)

যথাসময়ে গুর্শাস্পের দূত এসে হাজির হয় দিল্লিতে। নিজের স্নেহাস্পদ গুর্শাস্পের সফলতার খবরে খুব আনন্দিত হন সুলতান। তিনিও যে এতবার রাখতেন যে তার পুত্রবত গুর্শাস্প একদিন অনেক উন্নতি করবে।

তিনি গুর্শাস্পের দূতকে স্বর্ণমুদ্রা ইনাম দেন ও বলেন, " যাও দূত, গিয়ে গুর্শাস্পকে বল যে তার বাহাদুরি ও জিন্দাদিলি দেখে আমি খুব খুশি হয়েছি। সে এতদিন পর এত দূর থেকে ফেরত আসছে। তাই তার এখন কষ্ট করে দিল্লি আসার দরকার নেই। আমি নিজে তার সাথে মোলাকাত করার জন্য, তাকে শাবাশি দেবার জন্য কড়ায় যাব। "

সুলতানের বিশ্বস্ত সভাসদ মালিক আহমেদচাপের কিন্তু সুলতানের এই ব্যস্ততা ভাল লাগেনা। মনের কোণে কোথায় যেন একটু অস্বস্তি খোঁচা মারে। থাকতে না পেরে বলে ওঠে মালিক আহমেদচাপ, " জাঁহাপনা জান বখশে। এটা কিন্তু নিয়ম বহির্ভূত কাজ হচ্ছে। বলছিলাম কি এত জলদবাজিতে কড়ায় যাবার দরকার কি?  গুর্শাস্প যাই করে থাকুন না কেন তা তো তার ফর্জ। কেননা তিনি সুলতানের কর্মচারী। অন্য সব সিপাহসালারের মত জঙ্গ ফতেহ করে তারও প্রথমে দিল্লিতে এসে সুলতানের সঙ্গে দেখা করে জঙ্গের সমস্ত এত্তেলা দেওয়া উচিত ও মাল আসবাবের হিসাবপত্র দেওয়া উচিত। রিসালা ( সামরিক কাজে ব্যবহৃত জিনিস পত্র) ও ফৌজের ক্ষয় ক্ষতি কি হল তারও এত্তেলা আলা সিপাহসালারকে (প্রধান সেনাপতি কে) দেওয়া দরকার। জান কি অমান, সুলতান যদি কড়ায় গিয়ে আপনার কোন খতরা হয়। যদি আপনার কোন...."

সুলতান কিন্তু একথা শুনে বিরক্ত হন। " কি ভুলভাল বকওয়াস করছ তুমি আহমেদ। ওখানে আমার আবার কি খতরা হতে পারে। গুর্শাস্প তো শুধু আমার ভাতিজাই নয় সে আমার দামাদ ( জামাই) ও। তুমি কি গুর্শাস্পকে হিংসা করছ নাকি। তাহলে তা ভুলে যাও তুরন্ত। আমি আমার আজিজ (প্রিয়) গুর্শাস্পের হৌসলা বুলন্দ করতে (উতসাহ দিতে) জরুর কড়ায় যাব।" 

কোন বাধা না মেনে, সুলতান জালালউদ্দীন জলপথে দ্রুতগতিতে নিজের প্রিয় গুর্শাস্পের সাথে দেখা করার জন্য যাত্রা করেন। সাথে কয়েকজন মাত্র দেহরক্ষী। 

সুলতানের মূল সেনাবাহিনী যাত্রা করে স্থলপথে। 

সুলতানের দূত গিয়ে গুর্শাস্পকে সংবাদ দেয় যে সুলতান জলপথে আসছেন। 

(৮)

কড়ায় গঙ্গার তীরে দাঁড়িয়ে আছেন গুর্শাস্প। তার সাথে কয়েকজন দেহরক্ষী। তার বিজয়ী সৈন্য দল দাঁড়িয়ে আছে একটু তফাতে। 

সুলতানের আসার সময় হয়ে গেছে। সুলতান তাকে কিভাবে শাবাশি দেবেন, কি ভাবে পুরষ্কৃত করবেন হয়ত এই সবই ভাবছেন গুর্শাস্প। কিন্তু তার ভাবলেশহীন মুখ দেখে বোঝার উপায়ও নেই যে তার মনের মধ্যে কি চলছে।

কিছু সময় পর খানিক দূরে গঙ্গার বাঁকে একটা বড় নৌকা দেখা দেয়। নৌকার মাস্তুলে উড়ছে দিল্লির সুলতানের পরচম (পতাকা)। 

একটু বোধহয় অধীর হন গুর্শাস্প। কত জন লোক আছে সুলতানের সাথে? দিল্লি থেকে সঠিক খবর এসেছে তো? 

গুর্শাস্পের কানে বাজতে থাকে বেগম সাহেবার সেই কথাগুলো - তুমি ভিখমাঙ্গা, তুমি সাধারন সুবেদার, তুমি দিল্লিতে ঘর জামাই হয়ে থাক, আমার আব্বা হুজুরের মেহেরবাণীতে তুমি সুবেদার হয়েছ, তোমার নিজের কোন অউকাত নেই... 

গুর্শাস্পের দুই হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়। অস্ফুটে বলেন, " বেগম সাহেবা, আজ আপনি বুঝবেন আমি কি। "

একটু পরেই সুলতানের নৌকা এসে গঙ্গার ঘাটে লাগে। গুর্শাস্প ও তার কয়েকজন দেহরক্ষী এগিয়ে  যান নৌকার দিকে। 

সুলতানও নৌকার কামরার থেকে বাইরে বেড়িয়ে এসেছেন। 

গুর্শাস্পও তার এক জন দেহরক্ষীকে নিয়ে নৌকায় ওঠেন।

" বেটা গুর্শাস্প, আল্লাহ তুমহে সালামত রাকখে.." বলতে বলতে হাসিমুখে এগিয়ে আসেন সুলতান। দুহাত বাড়িয়ে দেন প্রিয় গুর্শাস্পকে আলিঙ্গন করবেন বলে। 

গুর্শাস্পও সুলতানের কদমবোসী করার জন্য ঝুঁকে পড়েন। 

পরমুহুর্তেই গুর্শাস্পের পেছনে দাঁড়ানো দেহরক্ষীর কোষমুক্ত তরবারি সূর্য্যালোকে ঝলসে ওঠে আর সুলতানের স্কন্ধচ্যুত মস্তক গড়িয়ে পড়ে নৌকার পাটাতনের উপরে। 

পরক্ষণেই নৌকায় উঠে আসে গুর্শাস্পের অন্যান্য দেহরক্ষীরা। তারা তীব্র বেগে আক্রমণ করে সুলতানের সঙ্গী সাথীদের। সুলতান নিজের প্রিয় গুর্শাস্পের সাথে দেখা করতে আসছিলেন তাই সাথে বেশি লোকজন নিয়ে আসেননি। তাই কিছুক্ষনের মধ্যে সুলতানের সঙ্গী সাথীদের অবস্থাও হয় সুলতানের মত।

দিল্লির সুলতানির ও মোঘল শাসনের সময়কালে প্রিয়জনদের হত্যা করে শাহী তখত দখল করা ছিল সাধারণ ঘটনা। কিন্তু এই রকম বিশ্বাসঘাতকতার নজির ভারতের ইতিহাসে আর নেই। 

এমনকি ঔরাঙ্গজেবের মত মানুষও অন্তত সন্মুখ যুদ্ধে নিজের ভাইদের পরাস্ত করেছিলেন ও নিজের পিতাকে হত্যা না করে বন্দী করে রেখেছিলেন। 

ক্রমশ..


0 Comments:

Post a Comment

Subscribe to Post Comments [Atom]

<< Home