Monday, February 1, 2021

পীর বাদশাহ

 পীর বাদশাহ

(১)

ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়েছেন সিপাহশালার রদন্দাজ খাঁ। এই রকম উৎসাহহীন সৈন্যদল নিয়ে যে যুদ্ধ জেতা যায় না তা তিনি বোঝেন।


সামান্য সিপাহী হয়ে বাদশাহী ফৌজে ঢুকেছিলেন রদন্দাজ খাঁ। তারপর নিজের শৌর্য্য বীর্য্য বাহুবল দেখিয়ে ধাপে ধাপে উপরে উঠে এসেছেন। বর্তমানে বাদশাহ ঔরঙ্গজেবের প্রধান সেনানায়কদের মধ্যে তিনি একজন।


ভাল করেই জানেন তিনি যে উৎসাহে পরিপূর্ণ কিন্তু সংখ্যায় নগণ্য সৈন্যদল নিয়ে বিশাল সৈন্যবাহিনীকেও পরাস্ত করা সম্ভব। কিন্তু উৎসাহহীন বিশাল সেনাবাহিনী নিয়েও মুষ্টিমেয় শত্রুকেও পরাজিত করা অতি দুষ্কর কর্ম। সে শত্রুও আবার যেমন তেমন নয়, একেবারে "সতনামী" শত্রু, যারা ইতিমধ্যে দুবার শাহী সেনাদলকে পরাস্ত করেছে।


সতনামী বিদ্রোহ দমন করার জন্য বাদশাহ ঔরঙ্গজেব তোপখানা সহ পনের হাজার শাহী মুঘল সৈনিক পাঠাবার নির্ণয় করেছেন। সেই সৈন্যদলের প্রধান সিপাহশালার নিযুক্ত হয়েছেন রদন্দাজ খাঁ।


কিন্তু সৈন্যদল পরিদর্শন করতে গিয়ে অবাক হন তিনি। সাধারণ সৈনিকদের, এমনকি অধীনস্থ সেনানীদেরও যেন যুদ্ধে যাবার কোন উৎসাহই নেই। নেহাতই বাদাশাহের আদেশ, তাই যেন তারা যাচ্ছে - এইরকম ভাব সবার মনে। অথচ এরা কোন ভীরু কাপুরুষ নয়। সবাই পোড় খাওয়া সৈনিক। এর আগে এইসব সৈনিকরা ও সেনানীরা অনেক জয় ছিনিয়ে এনেছে অনেক প্রতিকূলতার মধ্যে থেকেও।


" না: এইসব সৈন্য নিয়ে যুদ্ধ জেতা যায়না। সৈন্যদলের এই মনোভাব অতি অবশ্যই জাঁহাপনার নজরে আনা দরকার। " মনে মনে ভাবেন রদন্দাজ খাঁ এবং বাদশাহের সাথে দেখা করার জন্য লালকেল্লার দিকে ঘোড়া ছুটিয়ে দেন।


কারা এই সতনামীরা?  কেন তারা বিদ্রোহ করেছিল বাদশাহ ঔরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে যার জন্য এই বিপুল সমরায়োজন? এসব জানতে হলে আমাদের বাদশাহ ঔরঙ্গজেবের সময় থেকেও একটু পিছিয়ে যেতে হবে।


(২)


হিন্দুদের সামাজিক ও ধার্মিক ক্ষেত্রে ব্রাহ্মণদেরএকাধিপত্য আবহমান কাল ধরে চলে আসছে।


কিন্তু এর পাশাপাশি এই একাধিপত্য এবং জাতপাতের অন্ধবিশ্বাসের  ও অন্যান্য সামাজিক কুরীতির শিকল ভাঙার চেষ্টাও সেই সুপ্রাচীনকাল থেকে চলে আসছে। বৌদ্ধ এবং জৈনরা অনেকবার ব্রাহ্মণ্যবাদ এবং অন্যান্য সামাজিক কুরীতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে। অবশ্য পরে কালক্রমে এই দুই ধর্মের মধ্যেও নানা কুরীতি ঢুকে পড়ে।


এসবের পাশাপাশি হিন্দু ভক্তি ও বৈষ্ণব আন্দোলনের নেতারা ও প্রচারকরাও প্রাণপণে জাত পাত এবং কুসংস্কারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে এসেছেন। এদের মধ্যে সব থেকে বিখ্যাত কয়েকজন হলেন সন্ত কবীর দাস, সন্ত রুই দাস, মহাপ্রভু চৈতন্যদেব প্রভৃতি।


সন্ত রুই দাস ছিলেন তথাকথিত ছোট জাতের অন্তর্গত। তিনি প্রচার করেন যে ঈশ্বরের কাছে উঁচু জাত নীচু জাত বলে কিছু নেই। যে কেউ নিজের ইচ্ছামত ঈশ্বরের আরাধনা করতে পারে। এই স্বাধীনতা সবারই আছে।


 নিজের উদার মতবাদের জন্য রুই দাস বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। এই মতবাদকে অবলম্বন করে " রুইদাসিয়া সংগঠন " নামের এক বিশাল সংগঠন গড়ে ওঠে। এই শক্তিশালী সংগঠন বিভিন্ন সামাজিক কুরীতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালাতে থাকে।


এই রুইদাসিয়া সংগঠনেরই একটা শাখা ছিল সতনামী সংগঠন।


বর্তমানের হরিয়ানা প্রদেশের অন্তর্গত নারনৌলের কাছের বিজেসর গ্রামের অধিবাসী বীরভান ১৫৪৩ সালে এই সতনামী সংগঠনের ভিত্তি স্থাপন করেন। এই সংগঠনের সদস্যরা নিজেদের সতনামী বলতো।


ধীরে ধীরে এই সতনামী সংগঠন বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে। তথাকথিত নিম্ন বর্ণের ও পেশার ব্যক্তিরা,  যেমন চাষী, গোয়ালা, ডোম, চামার,  আহীর ইত্যাদি এই সতনামী সংগঠনের সাথে যুক্ত হয়।


এই সতনামীরা সন্ন্যাসীদের মত গেরুয়া বস্ত্র ধারণ করতো। নিজেদের সংগঠনের আদর্শকে অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলতো এবং সেই নিয়ম মত জীবন যাপন করতো। নিজেদের আচারে ব্যবহারে এবং ব্যক্তিগত জীবনে এরা ছিল অত্যন্ত সদাচারী। কোন রকম অন্যায় বা অসৎ কাজে এরা লিপ্ত হতো না।


তবে নিজেদের সংগঠনের উপর কোনরকম অন্যায় বা কটাক্ষ এরা বরদাস্ত করতো না। এবং সব সময় তার তীব্র প্রতিবাদ করতো।


এদের মধ্যে বেশির ভাগই ছিল বিভিন্ন রকম অস্ত্র চালনায় নিপুণ। এরা নানা রকম অস্ত্রে শস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করতো।


এদের বিরোধ বাঁধত বিশেষ করে সরকারি কর্মচারীদের সাথে। এরা সরকারি কর্মচারীদের কোন রকম অন্যায় বা শোষণ বরদাস্ত করতো না।

অবশ্য এদের উগ্র মনোভাবের জন্য সরকারি কর্মচারীরাও এদের বিশেষ ঘাঁটাতো না।


পরবর্তী কালে এই সতনামীদের মধ্যে এক অদ্ভুত প্রথার প্রচলন হয়। নিজেদের মধ্যে আরো বেশি একতা আনার জন্য এরা নিজেদের চুল দাড়ি গোঁফ এমনকি ভুরু পর্য্যন্ত কামিয়ে ফেলতে শুরু করে।


(৩)


১৬৭২ সাল। দিল্লির শাহী তখতে তখন বাদশাহ ঔরঙ্গজেব বিরাজমান। এমন সময় একদিন এক শাহী পেয়াদা সরকারী কোন কাজে নারনৌলের কাছের কোন এক গ্রামের রাস্তা দিয়ে কোথাও যাচ্ছিল। হটাৎই তার নজরে পড়ে যে শাহী সড়কের পাশের এক ক্ষেতে এক গেরুয়া বস্ত্র পরা চাষি চাষ করছে। তার চুল দাড়ি গোঁফ ভুরু সব পরিষ্কার ভাবে কামানো। এরকম এক অদ্ভুত মূর্তি দেখে শাহী পেয়াদা হাসি সামলাতে পারে না।


হাসির আওয়াজে সেই অদ্ভুত মূর্তি চাষি পেছন ফিরে শাহী পেয়াদাকে দেখে ক্রুদ্ধ স্বরে জিজ্ঞাসা করে, " এই, তুই হাসছিস কেনো? "


" আরে এই ব্যাটা ন্যাড়ার কথা শোনো। ওরে ন্যাড়া তোকে দেখে তো সবাই হাসবে।" হা: হা: হা:...শাহী পেয়াদা আবার বেদম হাসিতে ভেঙে পড়ে।


" এই খবরদার বলছি, হাসবি না। আর ন্যাড়া ন্যাড়া বলবি না। আমি সতনামী।"


" ওরে তুই সতনামী হোস কি বদনামী, তাতে আমার কি?  তবে তোকে দেখে হাসি পাচ্ছে তো তার আমি কি করবো...হা: হা:হা:"


" কি বললি, আমি বদনামী?  দাঁড়া, তোকে মজা দেখাচ্ছি।" এই বলে সেই চাষি আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে শাহী পেয়াদার দিকে ছুটে আসতে থাকে।


সেই চাষি কাছে আসতেই শাহী পেয়াদা কিছু না ভেবে চিন্তে অনেকটা আত্মরক্ষার খাতিরেই নিজের লাঠির এক ঘা সেই চাষির মাথায় বসিয়ে দেয়। 


চাষির মাথা ফেটে রক্ত ঝরতে থাকে। কিন্তু সেই লম্বা স্বাস্থ্যবান জোয়ান চাষি তাতে কাবু হয়না। নিজের ক্ষতস্থানে হাত চাপা দিয়ে সে জোরে জোরে চেঁচাতে থাকে।


তার চেঁচানি শুনে আসে পাশের ক্ষেত থেকে আরো কয়েকজন সেইরকম গেরুয়া বস্ত্র পরিহিত অদ্ভুত দর্শন চাষি ছুটে আসে।


প্রথম চাষির মাথা থেকে রক্ত ঝরছে আর হতভম্ব পেয়াদার হাতে রক্তমাখা লাঠি -- এই দেখে তাদের সিদ্ধান্তে উপনীত হতে কোন রকম বেগ পেতে হয়না। চাষিরা সবাই মিলে শাহী পেয়াদাকে ঘিরে ধরে। বিপদ বুঝে পেয়াদাও নিজের পদমর্য্যাদা ভুলে ক্ষমা চাইতে থাকে।


কিন্তু ততক্ষণে বারুদের স্তূপে আগুন ধরে গেছে। সতনামী চাষির দল প্রচণ্ড ক্রোধে শাহী পেয়াদাকে মারধোর শুরু করে দেয়।


সতনামীদের সহানুভূতি সব সময় হতদরিদ্র  যুগ যুগ ধরে বঞ্চণার শিকার ও পদ দলিত তথাকথিত নিম্নবর্ণের ব্যক্তিদের প্রতি ছিল। কেননা তাদের নিজেদের মধ্যেও বেশির ভাগ মানুষই ছিল সেই বর্গের প্রতিনিধি।


শাহী পেয়াদা ছিল সমাজের সব থেকে উঁচু তলার অত্যাচারী শাসকের প্রতিনিধি। তাই মার খেতে খেতে যখন শাহী পেয়াদার মৃতদেহ মাটিতে লুটিয়ে পড়ল তখন সতনামী চাষিদের ক্রোধ শান্ত হল।


ক্রমশ:



0 Comments:

Post a Comment

Subscribe to Post Comments [Atom]

<< Home