প্রোপোজ ডে
প্রোপোজ ডে
আজ ৮ ফেব্রুয়ারি - প্রোপোজ ডে। কিন্তু এইরকম একটি প্রোপোজাল বা বিবাহ প্রস্তাবের কথা আপনারা জানেন কি। আসুন, আমরা ইতিহাসের পথ ধরে একটু পিছিয়ে যাই।
বিচারালয়ের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আছে তিন আসামী। দুই পুরুষ আর এক নারী। ভারত স্বাধীন করার জন্য এরা বেছে নিয়েছে সশস্ত্র বিপ্লবের পথ। তাই ব্রিটিশ শাসকদের চোখে এরা অপরাধী।
এই পুরুষদের মধ্যে একজনকে বিপ্লবীরা ডাকে মাস্টারদা, অন্য জনকে ডাকে ফুটুদা। আর নারীটির নাম কল্পনা দত্ত।
মাস্টারদা কে ছিলেন তা নিশ্চয় কাউকে বলতে হবেনা। বিপ্লবী তারকেশ্বর দস্তিদারের ডাক নাম ছিল ফুটুদা।
চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুট করার মামলা চলছে এই তিন আসামীর বিরুদ্ধে।
মাস্টারদা, তারকেশ্বর দস্তিদার এবং কল্পনা দত্তকে বিচারের জন্য ইন্ডিয়ান পেনাল কোডের ১২১/১২১এ ধারা অনুযায়ী স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়।
এই ট্রাইব্যুনালের কমিশনাররা ছিলেন, বাখরগঞ্জের দায়রা জজ ডব্লিউ ম্যাকসার্পি, সিলেটের অতিরিক্ত দায়রা জজ রজনী ঘোষ এবং চট্টগ্রামের দায়রা জজ খোন্দকার আলী তোয়েব।
১৫ জুন ১৯৩৩ এ শুরু হওয়া এ মামলায় কঠোর গোপনীয়তা অবলম্বন করা হয়। ১৪ আগস্ট ১৯৩৩ সালে এই মামলার রায় ঘোষণা করা হয়।
মামলার রায় ঘোষণার আগে একদিন বিপ্লবী তারকেশ্বর দস্তিদার একদিন কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েই কল্পনাকে বললেন, " কল্পনা, তুই নিশ্চয় অনুভব করেছিস যে তোকে আমার খুব ভাল লাগে। যদি মৃত্যুকে ফাঁকি দিতে পারি তাহলে তুই কি আমার জন্য অপেক্ষা করবি। "
স্মিত হাসেন কল্পনা তার ফুটুদার দিকে তাকিয়ে। তাঁরও মন যে বাঁধা পড়েছে। কিন্তু কি বলবেন তিনি। তারা সবাই তো হাঁটছেন অগ্নিপথের উপর দিয়ে। সামনে ঘোর অনিশ্চিত ভবিষ্যত। কল্পনা ফুটুদার দিকে তাকিয়ে চুপ করে থাকেন। মৌনতা তো সম্মতিরই লক্ষণ।
কিন্তু তখন নিশ্চয় তাঁরা বোঝেন নি যে এই বিবাহ প্রস্তাব বা প্রোপোজাল অমর হয়ে যাবে ভারতের ইতিহাসে।
আনন্দবাজার পত্রিকার খবর ছিলঃ “চট্টগ্রাম ১৪ই আগস্ট—অদ্য দ্বিপ্রহর ১২ ঘটিকার সময় স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল হইতে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠনের মামলার রায় প্রদত্ত হয়। ট্রাইব্যুনাল সূর্য সেনকে ১২১ ধারা অনুসারে দোষী সাব্যস্ত করিয়া প্রাণদন্ডে দন্ডিত করেন। ওই একই ধারায় তারকেশ্বর দস্তিদারের প্রতিও প্রাণদন্ডের আদেশ প্রদত্ত হয়। কুমারী কল্পনা দত্তকে ভারতীয় দন্ডবিধির ১২১ ধারা অনুসারে দোষী সাব্যস্ত করিয়া তাঁহার প্রতি যাবজ্জীবন দন্ডাদেশ প্রদান করা হয়। আদালত প্রাঙ্গনের চারিদিকে পুলিশের বিশেষ বন্দোবস্ত করা হইয়াছিল। রায় প্রদত্ত হইবার পুর্বে সেনাদল কিছুকাল শহরে কুচকাওয়াজ করে। আসামীরা শান্তচিত্তে দন্ডাদেশ গ্রহণ করে এবং তৎক্ষণাৎ আদালত হইতে স্থানান্তরিত করা হয়। তাঁহারা বিপ্লবাত্মক ধ্বনি করিতে করিতে আদালত গৃহ ত্যাগ করে। ট্রাইব্যুনালের প্রেসিডেন্ট রায়ের উপসংহারীয় অংশ পাঠ করেন। ১৫০ খানা টাইপ করা কাগজে প্রদত্ত হইয়াছে।”
মামলার রায় প্রদানের পর তিনজন বিপ্লবীর পক্ষে কলকাতা হাইকোর্টে আপিলের আবেদন করা হয়। ১৪ নভেম্বর ১৯৩৩ সালে হাইকোর্ট প্রদত্ত রায়ে স্পেশাল ট্রাইব্যুনালের দেয়া দন্ড বহাল রাখে।
মাস্টারদা আর তারকেশ্বর দস্তিদার প্রাণদান করেন ফাঁসির মঞ্চে। কল্পনা জেল থেকে ছাড়া পান ১৯৩৯ এ। ১৯৪০ এ স্নাতক হন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তারপর যোগদান করেন কম্যুনিস্ট পার্টি অফ ইণ্ডিয়া তে।
১৯৪৩ এ তাঁর বিবাহ হয় কম্যুনিস্ট পার্টি অফ ইণ্ডিয়ার জেনারেল সেক্রেটারি পূরণ চাঁদ যোশির সাথে।
পূরণ চাঁদ যোশি যখন কল্পনাকে বিবাহের প্রস্তাব দেন তখন কল্পনা বলেছিলেন, " আমি কিন্তু বিপ্লবী তারকেশ্বর দস্তিদারকে কথা দিয়েছিলাম। "
কল্পনা বোধহয় তাঁর ফুটুদাকে ও সেই প্রোপোজালকে আজীবন মনে রেখেছিলেন।
এই অপূর্ব বিবাহ প্রস্তাব বা প্রোপোজাল যিনি পেয়েছিলেন সেই বিপ্লবী কল্পনা দত্তের আজ প্রয়াণ দিবস (৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৫)।
(তথ্যসূত্রঃ কল্পনা দত্ত লিখিত "চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার আক্রমণকারীদের স্মৃতিকথা"।)


0 Comments:
Post a Comment
Subscribe to Post Comments [Atom]
<< Home