পীর বাদশাহ
পীর বাদশাহ
(৭)
লালকেল্লার দেওয়ান-ই-খাস এ, বিকেলের নামাজ সারা হলে, বাদশাহের মুখোমুখি হলেন রদন্দাজ খাঁ। কুর্ণিশ করে বলেন, " বাদশাহ সালামত, বেওয়াক্ত আসার জন্য গোলামের খতা (অপরাধ) মাফ করুন। একটা আরজি নিয়ে এসেছি বাদশাহ সালামত।"
" সিপাহসালার, তোমার তো এতক্ষণে নারনৌলের দিকে যাত্রা করার কথা। তুমি এখন এখানে কেন?"
অত:পর রদন্দাজ খাঁ বাদশাহকে সব কথা খুলে বলেন। সতনামীদের নেত্রী সেই বৃদ্ধার কথা, গুজবের কথা, সেই গুজবের ফলে শাহী সৈনিকদের ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ার কথা, সবই তিনি বাদশাহের গোচরে আনেন।
মৃদুমন্দ হাসতে হাসতে বাদশাহ ঔরঙ্গজেব সব কথা শোনেন। রদন্দাজ খাঁ থামতেই বাদশাহ বেশ জোরে হেসে ফেলেন। বলেন, " ও: এই তোমার সমস্যা! সতনামীদের উস্কানি দেওয়া ওই বুড়িয়া ভীষণ চালাক আর মক্কার (শয়তান)। কিন্তু আমিও তামাম হিন্দুস্তানের বাদশাহ। চলো আমার সঙ্গে। তোমার সব মুশকিল আসান করে দিচ্ছি।"
অবাক রদন্দাজ খাঁ বাদশাহের পিছুপিছু দেওয়ান-ই-খাস থেকে বেরিয়ে আসেন।
দেওয়ান-ই-খাসের বাইরে তখন কামাল উদ্দীন, হামিদ খাঁ, দবী খাঁ, ইস্কান্দার ইয়ার বকশি, সৈয়দ মীরতাজ খাঁ, পেইরাল মেওয়াতি, মহীউদ্দীন মহম্মদ ও আরো অনেক সেনা নায়ক ও সর্দাররা ব্যগ্র হয়ে অপেক্ষা করছিলেন। বাদশাহকে বেরোতে দেখে সবাই কুর্ণিশ করেন ও বাদশাহের পিছুপিছু লালকেল্লা থেকে বেরিয়ে আসেন।
পনেরো হাজার মুঘল সৈনিক দাঁড়িয়ে আছে বাইরের প্রান্তরে। তাদের দেখে মনে হচ্ছে যেন তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। চারপাশে হাতি ঘোড়া উট ছুটোছুটি হইচই করছে। সৈনিকরা গলা নামিয়ে ফিসফিস করে নানা রকম অলীক আলোচনা করছে।
কেউ বলছে, " ওই বুড়িয়া স্বয়ং দোজখ থেকে নেমে এসেছে।"
" আরে না না। তুমি পুরোটা জানো না। স্বয়ং আজ্রাইল বুড়িয়া সেজে এসেছেন সব ধ্বংস করতে।"
" কিয়ামতের দিন এসে গেল। তৌবা করবার ওয়াক্ত মিললো না । "
" আরে পরশুই তো আমার চাচাজাদ ভাই নারনৌল থেকে এসেছে। ও বললো যে ওই বুড়িয়া নাকি যার দিকে তাকায় সেই নাকি মুঠঠি ভর রাখ হয়ে যায়। আরে তাই না তাহির খাঁ হেরে গেছে।"
যত মুখ তত কথা আর তত গুজব। এরই মধ্যে স্বয়ং বাদশাহকে আসতে দেখে সৈনিকদের মনে একটু উৎসাহের সঞ্চার হয়। সবাই সটান দাঁড়িয়ে, স্তিমিত গলায় হলেও, জয়ধ্বনি দেয়, " বাদশাহ-ই-হিন্দুস্তান জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ!!"
(৮)
বাদশাহ ঔরঙ্গজেব প্রান্তরের একটা উঁচু যায়গায় গিয়ে দাঁড়ান। হাত তুলে জয়ধ্বনি থামাবার নির্দেশ দেন।
জয়ধ্বনি থামলে বাদশাহ আবেগপূর্ণ স্বরে বলতে শুরু করেন, " শুনলাম আমার এই বাহাদুর মুঘল সৈনিকরা নাকি সতনামী কাফেরদের নেতা এক মক্কার বুড়িয়ার ভয়ে কাবু হয়ে পড়েছে। ওই বুড়িয়া হয়তো জাদু টোনাও কিছু কিছু জানে। কিন্তু তোমরা তো জানো যে শয়তান আল্লাহ্ পরস্ত ইসলাম পরস্ত সাচ্চা ইনসানের উপর কখনো ফতেহ পায়নি।
তোমরা আমার দিকে দেখ। আমি বাদশাহ -ই-হিন্দুস্তান। তবুও আমি ইসলামের সব নিয়ম কানুন পুরোপুরি কঠোর ভাবে মেনে চলি। যেখানেই থাকি না কেন, দিনে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তে আমার কখনো ভুল হয়না। আমি শরাব পান করি না। তওয়াইফদের নাচ দেখিনা, গান বাজনা শুনি না।
কোনরকম আভূষণ বা মণি মাণিক্য শরীরে ধারণ করি না। তোমরা হর রোজ যা খাও আমিও তাই খাই। তোমাদের মত আমিও জমিনে শুই। পীর ফকির দরবেশদের ইসলামের নিয়ম মত খয়রাত জাকাত করি। কোরাণ শরীফ লিখে ও নামাজের টুপি বানিয়ে আমি যা রোজগার করি শুধু মাত্র তাই দিয়ে আমার নিজের রোজকার খরচ চালাই। এখন তোমরাই বলো আমি কি আল্লাহ্ পরস্ত ইসলাম পরস্ত সাচ্চা ইনসান নই? "
পনেরো হাজার সৈনিক একযোগে চেঁচিয়ে ওঠে, " বাদশাহ সালামত, আপনি একজন নেকদিল সাচ্চা আল্লাহ্ পরস্ত ইনসান।"
বাদশাহ ঔরঙ্গজেব আবার ওজস্বী ভাষায় বলতে শুরু করেন, " আমার বাহাদুর সৈনিকেরা, তোমরা ইসলামের শক্তি যে কতটা তা তামাম হিন্দুস্তানকে বুঝিয়ে দিয়েছ। ইসলামের পরচম (পতাকা) আজ তামাম হিন্দুস্তানে বুলন্দ হয়েছে তোমাদেরই বাহাদুরির জন্য। কত বড় বড় রাজা, সেনাপতি, কত বড় বড় সেনাদল ইসলামের শক্তির মোকাবিলা করতে গিয়ে রাখ হয়ে গেছে। তোমাদের তরবারির সামনে, বাহাদুরির সামনে, রাজপুত, মারাঠা, তেলেঙ্গা কেউ দাঁড়াতে পারেনি। আর সেই তোমরা কিনা একটা মক্কার বুড়িয়াকে ভয় পাচ্ছ।
দেখ সবাই আমার দিকে। আমি কি শুধুই বাদশাহ-ই-হিন্দুস্তান? না। আমি কি তাহলে শাহানশাহ-ই-হিন্দুস্তান? আমি কি তামাম হিন্দুস্তানের মালিক? না আমি তাও না। আমি হলাম দরবেশ। আমি আমার তামাম জিন্দেগী আল্লাহ্র বন্দেগীতে কাটিয়েছি। আল্লাহতালার দোয়া হর ওয়াক্ত আমার সরপরস্ত হয়ে আছে। আমি ফকির!!! আমি পীর!!! আমি পীর!!!...."
সমস্ত সৈনিক ও সেনানীরা একবারে মন্ত্র মুগ্ধ হয়ে বাদশাহের কথা শুনছিল। বাদশাহ ইশারায় ঝাণ্ডাবরদারকে (পতাকা বাহক) নিজের কাছে ডাকেন।
সে কাছে এলে পর বাদশাহ মুন্সীর কাছ থেকে কলম নিয়ে শাহী ঝাণ্ডার উপর কিছু লিখতে থাকেন। তারপর আকাশের দিকে দুহাত তুলে অস্ফুট স্বরে খানিকক্ষণ প্রার্থনা করেন। তারপর শাহী ঝাণ্ডায় তিনবার ফুঁ দেন।
তারপর আবার দৃপ্তকণ্ঠে বলতে শুরু করেন, " আমি দরবেশ ঔরঙ্গজেব, ফকির ঔরঙ্গজেব, পীর ঔরঙ্গজেব, ইসলাম পরস্ত ঔরঙ্গজেব, আল্লাহ্ পরস্ত ঔরঙ্গজেব নিজের হাতে এই ঝাণ্ডায় আল্লাহ্র দোয়া লিখে দিলাম। ওই মক্কার বুড়িয়ার যাদু টোনা আর তোমাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না। ইনশাআল্লাহ, এবারেও ফতেহ-ই-জঙ্গ ইসলামের হবে। ফতেহ-ই-জঙ্গ তোমাদেরই হবে।
বাদশাহের দৃপ্তভাষণ সৈনিকদের মধ্যে নতুন উৎসাহ জাগিয়ে তোলে। চমৎকৃত সৈনিকরা নিজেদের অস্ত্র আকাশের দিকে তুলে আল্লাহ্ ও বাদশাহের নামে জয়ধবনি তোলে। তাদের উৎসাহ দেখে কে বলবে যে একটু আগেই এরা ধুঁকছিল।
বাদশাহ ঔরঙ্গজেব, এবার সিপাহশালার রদন্দাজ খাঁ এর দিকে তাকিয়ে বলেন, " তোমার মুশকিল আসান করে দিয়েছি। যাও এবার জঙ্গ ফতেহ করে এস।"
(৯)
যখন মুঘল সেনাবাহিনী নারনৌলের কাছে গিয়ে পৌঁছায় তখন সতনামীরা আবার তীব্র গতিতে আক্রমণ করে। ভয়ানক যুদ্ধ শুরু হয়। দুপক্ষই প্রাণপনে লড়তে থাকে। রণনিপুণ ও শক্তিশালী মুঘল সেনাবাহিনীর প্রচণ্ড আক্রমণ উপেক্ষা করে সতনামীরা অসাধারণ বীরত্বের প্রদর্শন করে। অবশেষে রদন্দাজ খাঁ শুধুমাত্র সংখ্যাধিক্যের জন্য অতিকষ্টে সতনামীদের পরাজিত করতে সক্ষম হন।
প্রায় সাত হাজার সতনামী এই যুদ্ধে প্রাণ দেয়। অপরদিকে সিপাহশালার রদন্দাজ খাঁ যুদ্ধে জিতলেও শাহী মুঘল সেনা প্রচণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পনেরো হাজারের মধ্যে মাত্র দেড় হাজারের মত মুঘল সৈনিকই যুদ্ধশেষে দিল্লি ফিরতে পেরেছিল। তবে এরপর থেকে বাদশাহ ঔরঙ্গজেব আর সতনামীদের পিছনে কখনো লাগেননি। শুধু অস্ত্র শস্ত্র সাথে রাখার ব্যপারে কিছু বিধি নিষেধ চালু করেছিলেন। সতনামীরাও নিশ্চিন্ত মনে নিজেদের আসল কাজ, সামাজিক ভেদভাব দূর করাতে মনযোগ দিয়েছিল।
বাদশাহ ঔরঙ্গজেব কুশলী ও বুদ্ধিমান প্রশাসক ছিলেন। তিনি ভালো করেই জানতেন যে ধর্মের আশ্রয় নিয়ে সবাইকে যত সহজে উৎসাহিত ও উদ্বুদ্ধ করা যায় ততটা আর কোন কিছুর সাহায্যে করা যায় না। তাই নিজের সৈন্যদলকে রণে উৎসাহিত করতে তিনি সেই ধর্মের পথই অবলম্বন করেছিলেন। ধর্মের প্রতি সাধারণ মানুষের দুর্বলতা ও দৃঢ় বিশ্বাসকে সুচতুর ভাবে কাজে লাগিয়ে তিনি সতনামী বিদ্রোহ দমন করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
যুদ্ধের শেষে সেই বৃদ্ধাকে কিন্তু রদন্দাজ খাঁ জীবিত বা মৃত খুঁজে পাননি। সেই বৃদ্ধার কি পরিণতি হয়েছিল শেষ পর্যন্ত্য সে সম্বন্ধে ইতিহাস নীরব।
সতনামী বিদ্রোহ দমন করে রদন্দাজ খাঁ দিল্লি ফিরে এলে, বাদশাহ ঔরঙ্গজেব অতীব প্রসন্ন হয়ে তখত-ই-তাউস থেকে নেমে এসে তাকে আলিঙ্গন করেন ও পরে " শজাঅত খাঁ " উপাধি প্রদান করে সন্মানিত করেন।
নিজের শাসনকালে অনেক বিদ্রোহ দমন করেছিলেন বাদশাহ ঔরঙ্গজেব। কিছু ঐতিহাসিকদের মতে যে সব বিদ্রোহ দমন করতে তাঁকে খুব বেগ পেতে হয়েছিল সতনামী বিদ্রোহ ছিল তাদের মধ্যে অন্যতম।
সমাপ্ত


0 Comments:
Post a Comment
Subscribe to Post Comments [Atom]
<< Home