Tuesday, March 9, 2021

ভোজ কয় যাহারে

 ভোজ কয় যাহারে 


(১)


প্রথমেই বলে রাখি যে এই ঘটনাটি কিন্তু আমার লেখা নয়। এই ঘটনাটি আমি শুনেছিলাম আমার পিতৃদেব স্বর্গত শ্রী সন্তোষ কুমার দত্ত মহাশয়ের কাছ থেকে।


গত শতাব্দীর চল্লিশের দশক। আমার পিতৃদেব তখন দিল্লির রাইসিনা বেঙ্গলি স্কুলের ছাত্র। তখন দিল্লি শহরে সাধারণ মানুষদের যাতায়াতের মাধ্যম ছিল সাইকেল ও টাঙ্গা। ছাত্র থেকে শুরু করে গেজেটেড অফিসার সবাই সাইকেল ব্যবহার করতেন ও তাতে স্ট্যাটাস সিম্বলের হানি হতনা। 


যারা বিখ্যাত লেখক যাযাবরের লেখা বই "দৃষ্টিপাত" পড়েছেন তারা ব্যাপার টা বুঝবেন। বইটি সেই সময়ের দিল্লির পটভূমিকায়  লেখা।


আমার দাদুর সরকারী কোয়ার্টার ছিল আরউইন রোডে। যার নাম এখন বাবা খড়ক সিং মার্গ। 


(২)


এবার পিতৃদেব যা বলেছিলে তা তাঁরই ভাষায় লিখছি।


তোদের দেখলে আমি অবাক হয়ে যাই। তোরা বাস ছাড়া চলতে পারিস না। এক দু মাইল যেতে গেলেও তোদের বাসে চড়তে হয়। আর আমরা আমাদের ছাত্র জীবন থেকে সাইকেলে অভ্যস্ত ছিলাম। এই সাইকেলে চড়েই সারা দিল্লি শহর ঘুরে বেড়িয়েছি। 


আর শুধু দিল্লি কেন, এই সাইকেল চালিয়ে একেবারে আগ্রা অব্দি ঘুরে এসেছি। তাও একবার নয় বেশ কয়েকবার। প্রথমবার সাইকেলে আগ্রা গেছিলাম হায়ার সেকেণ্ডারি পরীক্ষা দিয়ে। 


১৯৪৯ সালের গ্রীষ্মকাল। হায়ার সেকেণ্ডারি পরীক্ষা হয়ে গেছে। সামনে লম্বা ছুটি। আমরা চার বন্ধু ঠিক করলাম যে সাইকেলে আগ্রা যাব। 


দিল্লি থেকে সকাল সকাল যাত্রা শুরু করব। মথুরা বৃন্দাবনে দুদিন করে থেকে তার পর আগ্রা পৌঁছাব।  তারপর আগ্রায় কিছুদিন থেকে বাড়ি ফেরা। 


যাত্রা শুরুর আগের দিন রাত্রে পাশের কোয়ার্টারের কাকিমা এলেন একটা অনুরোধ নিয়ে।


" সন্তোষ, তোরা তো বৃন্দাবনে আর মথুরায় থাকবি। আমি গতবছর মানত করেছিলাম যে একজন ব্রাহ্মণ ভোজন করাব। তা সেই ব্রাহ্মণ ভোজন যদি মথুরায় বা বৃন্দাবনে করানো যায় তাহলে খুব ভাল হয়। আমি তোকে দশ টাকা দিচ্ছি। তুই বাবা, একজন সদব্রাহ্মণ দেখে ভোজন করিয়ে দিস।"


" ঠিক আছে কাকিমা, এ আর এমন কি ব্যাপার। ব্রাহ্মণ ভোজন করিয়ে দেব।" 


কাকিমা আমাকে দশ টাকা দিয়ে গেলেন। আমি মনে মনে ভাবতে লাগলাম যে একজন ব্রাহ্মণ ভোজন করাতে কি এত টাকা লাগবে। সেই সময়ের  হিসাবে দশ টাকা অনেক টাকা। তার উপর আবার মথুরায় বা বৃন্দাবনে খাবার খরচা দিল্লির থেকে কমই হবে। যাকগে এর থেকে কিছু বাঁচলে কাকিমাকে ফেরত দিয়ে দেব।


(৩)


দিল্লি থেকে ভোরে যাত্রা করে আমরা চার বন্ধু বিকেল নাগাদ মথুরা পৌঁছলাম। এক ধর্মশালায় উঠলাম। পরদিন সকালে ঘুরতে ঘুরতে হাজির হলাম মথুরা স্টেশনে। সেখানে দেখলাম যে অনেক পাণ্ডা ঘোরাঘুরি করছে। তাদের মধ্যে থেকে একজন অল্প বয়স্ক রোগা লম্বা পাণ্ডার সাথে আলাপ হল। পাণ্ডাজির বয়েস আমাদেরই মত। পাণ্ডাজির নাম রামদর্শন পাণ্ডা।  খানিকক্ষণ গল্প গাছা করার পর আমি পাণ্ডাজিকে ভোজনের জন্য আমন্ত্রণ জানালাম।


পাণ্ডাজি খুব খুশি হয়ে বললেন, " যজমান, এতো অতি উত্তম কথা। তবে এখন যাত্রীদের আসার সময়। আমাকে এখন যাত্রীদের ধর্মশালায় নিয়ে যেতে হবে। মন্দির - উন্দির দর্শন করাতে হবে। আমি ঠিক দো বাজে আপনাদের সাথে বড়বাজারের মোড়ে দেখা করব। আপ লোগো কা কল্যাণ হো যজমান। " 


(৪)


ঠিক দুটোর সময় আমি আর আমার এক বন্ধু বড়বাজারের মোড়ে পৌঁছে গেলাম। রামদর্শন পাণ্ডাজিও স্নান টান করে, ফোঁটা তিলক কেটে উপস্থিত। ওখানে সারি সারি মিষ্টি ও পুরী সব্জীর দোকান। রামদর্শন পাণ্ডাকে একটা দোকানের বেঞ্চিতে বসিয়ে দোকানদারকে বললাম পুরী সব্জী দিতে। 


দোকানদার একবার আড়চোখে রামদর্শনজির তাকিয়ে দুসের পুরী ও সেই অনুপাতে সব্জী শালপাতার পাতায় করে পরিবেশন করল। 


আমি মনে মনে ভাবলাম এত কি লোকে খেতে পারে নাকি। 


কিন্তু আমাদের দুই বন্ধুকে অবাক করে দিয়ে রামদর্শন পাণ্ডাজি অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে হাত চালাতে লাগলেন। দোকানের এক পাশে বিরাট থালায় খাঁটি ঘিয়ের হালুয়া রাখা ছিল। খেতে খেতেই রামদর্শনজি সেই দিকে আঙুল দেখালেন। দোকানদার সের খানেক হালুয়া দিল। তাও অতি দ্রুততায় উদরস্থ করে হাতের ইশারায় আবার পুরী সব্জী চাইলেন রামদর্শন পাণ্ডাজি। 


আবার সের দুয়েক পুরী সব্জী পরিবেশন করল দোকানদার। পুরী সব্জী উদরস্থ করতে করতে রামদর্শন পাণ্ডাজি এবার বরফি ও প্যাঁড়ার দিকে আঙুল তুললেন৷ দোকানদার তাও এক এক সের দিল। 


(৫)


সেই খাওয়ার বহর দেখে আমাদের তো চক্ষু চড়কগাছ। দোকানদার দিয়ে যাচ্ছে তো যাচ্ছেই আর রামদর্শন পাণ্ডাজির খাওয়া চলছে তো চলছেই। দোকানদারের দিতে যা দেরি। নিমেষে সব উড়ে যাচ্ছে। ওই রোগা শরীরের মধ্যে সব ঢোকাচ্ছে কোথায় কে জানে। 


চতুর্থবার পুরী ওজন করতে করতে দোকানদার জানাল যে খাবারের দাম চব্বিশ টাকা পার হয়ে গেছে। 


এবার আমার হুঁশ হয়। আমার পুঁজি তো দশ টাকা।  বন্ধু আমার কানে কানে বলে এবার ব্যাটাকে থামানো দরকার। নয়ত আমাদের সব টাকাই ব্যাটার পেটে ঢুকে যাবে আর আমাদেরও আর আগ্রা অব্দি যেতে হবেনা। মথুরা থেকেই দিল্লি ফিরতে হবে।


এর মধ্যে রামদর্শন জি রাবড়ির দিকে আঙুল তুলেছেন। দোকানদারও সের খানেক রাবড়ি রামদর্শনজির সামনে নামিয়ে রেখেছে।


এবার আমি অনুভব করি যে আমি বিপদের মধ্যে পড়তে চলেছি। এই আসুরিক খাওয়ার ব্যয় সামলানো আমার পক্ষে অসম্ভব। 


কিন্তু কি করি। দোকানদারকে বলে লাভ নেই। কেননা রামদর্শনজি যত খাবেন দোকানদারের ততই লাভ। 


(৬) 


অস্থির হয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে আসি। খোদ দ্বারকাধীশ বোধহয় আমার বিপদ বুঝতে পেরেছিলেন। তাই দোকানের সামনে আমার এক বৃদ্ধ ব্যক্তির সাথে দেখা হয়ে যায়। আমি কি করব বুঝে উঠতে না পেরে সেই বৃদ্ধকে সবকথা খুলে বলি।


বৃদ্ধ আমার বিপদ বুঝতে পারেন ও বলেন, " ও ভাঙ খেয়ে এসেছে। তাই এত খেতে পারছে। ওর খাওয়া এখনই থামানো দরকার। নয়ত ও খেয়েই যাবে যতক্ষণ না ও খেতে খেতে শুয়ে পড়ছে। আর কত টাকার যে ও খাবে তার ঠিক নেই। "


আমি কাতর ভাবে বলি,  " কি করে ওর খাওয়া থামাবো বলুন।"


বৃদ্ধ বলেন, " আচ্ছা আমি দেখছি। ওই পাণ্ডার নাম কি?"


আমি বৃদ্ধকে পাণ্ডাজির নাম জানাই ও ওনাকে নিয়ে দোকানে ঢুকি।


দোকানে ঢুকে দেখি যে রামদর্শনজিকে পঞ্চম বার পুরী সব্জী ও দ্বিতীয় বার রাবড়ি পরিবেশন করা হয়ে গেছে ও রামদর্শনজির মুখও সমান তালে চলছে।


দোকানে ঢুকেই সেই বৃদ্ধ রামদর্শন জিকে নাম ধরে ডেকে ব্রজভাষায় প্রচণ্ড ধমক দেন এবং আরো খেলে সে পেট ফেটে মরে যেতে পারে সেটা বুঝিয়ে বলেন। 


সেই ধমক খেয়ে রামদর্শন জি খানিকটা যেন অনিচ্ছা সহকারেই নিজের খাওয়া সংবরণ করেন।  পাতে যা পড়েছিল তা শেষ করে উঠে পড়েন। 


আমার কাছ থেকে এক টাকা ভোজন দক্ষিণা আদায় করে ও " আপ লোগো কা কল্যাণ হো যজমান " বলে, সেই বৃদ্ধের সাথে দোকান থেকে বেরিয়ে যান।


আমার মনে হল যে আমার বিপদ দেখে স্বয়ং দ্বারকাধীশ এসেছিলেন বৃদ্ধের বেশে আমাকে বিপদমুক্ত করতে।


তারপর দাম দিতে গিয়ে সব হিসাব পত্র করে দেখা গেল যে রামদর্শনজি সাইত্রিশ টাকার খাবার ভস্ম করে দিয়েছেন। 


তাজমহলের জন্য নয়, আমার প্রথম আগ্রা ভ্রমণ স্মরণীয় হয়ে আছে ওই রামদর্শন পাণ্ডাজির জন্যে যিনি কিছুক্ষণের জন্যে আমাকে চোখে আঁধার দর্শন করিয়ে ছিলেন।


সমাপ্ত


0 Comments:

Post a Comment

Subscribe to Post Comments [Atom]

<< Home