সিকন্দর - অল - সানি
সিকন্দর - অল - সানি
(৯)
যেদিন সুলতান জালাল উদ্দীন ফিরোজ খিলজি কে হত্যা করা হয় সেদিন তারিখ ছিল ১৯ জুলাই ১২৯৬। আর তাঁর হত্যাকারীর নাম ছিল মোহম্মদ সেলিম।
সমস্ত মৃতদেহগুলি তৎক্ষনাৎ গঙ্গায় জলসমাধি দেওয়া হয়। শুধু সুলতানের ছিন্ন মুণ্ড একটা বর্শার ফলকে গাঁথা হয় ও তারপর তা কড়া ও আওয়াধের সড়কে ঘোরানো হয়।
আলি গুর্শাস্প সেদিনই নিজেকে নতুন সুলতান হিসাবে ঘোষণা করেন।
এই তারিখের ব্যাপারে ঐতিহাসিকদের মধ্যে দ্বিমত আছে।
আমির খুসরো লিখেছেন যে এই দুটি ঘটনা ঘটেছিল ১৯ জুলাই ১২৯৬ এ। আবার ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দিন বারণী র মতে ঘটনা দুটি ঘটেছিল ২০ জুলাই ১২৯৬।
ঐতিহাসিক এ বি এম হাবিবুল্লার মতে
অবশ্য আমির খুসরো লিখিত তারিখটিই ঠিক।
হাতির পিঠে বসে কড়ার সড়কে মুঠো মুঠো স্বর্ণ মুদ্রা ছড়ান তিনি সাধারন নাগরিকদের মাঝে। যে সমস্ত আমিররা তাকে সমর্থন জানালেন তাদের পদোন্নতি করে উপাধি দিলেন মালিক। আর নিজের অন্যান্য সমর্থকদের উপাধি দিলেন আমির।
সব কিছু গুছিয়ে দিল্লির দিকে যাত্রা করতে তার কিছু বিলম্ব হল। এর মধ্যে তিনি ছলে বলে কৌশলে বিরোধী পক্ষের আমিরদেরও নিজের পক্ষে করে নিলেন।
এদের মধ্যে প্রমুখ হলেন - তাজুল মুলক কুচি, মালিক আবাজি আখুর বেক, মালিক আমির আলি দিওয়ানা, মালিক উসমান আমির আখুর, মালিক আমির খান প্রভৃতি।
এদের প্রত্যেককে ৫০ মন করে সোনা উপহার দেওয়া হল। এই আমিরদের সাথে যে সব সৈনিকরা এল তাদের প্রত্যেককে দেওয়া হল ৩০০ রূপোর টাকা।
এইভাবে দরাজ হাতে ধন রত্ন বিলির ফলে তার জন সমর্থন ও সৈন্যবল দুই ই দ্রুতগতিতে বাড়তে লাগল।
তবে সে সময় বর্ষাকাল হওয়ার দরুন গঙ্গা ও যমুনা নদীতে জল বেড়ে গিয়ে বন্যা হবার ফলে তিনি দ্রুত গতিতে দিল্লির দিকে অগ্রসর হতে পারলেন না।
(১০)
এদিকে সুলতান জালালউদ্দিনের হত্যার খবর দিল্লিতে পৌঁছালে সুলতানের বেগম, নিজের কনিষ্ঠ পুত্র কাদর খানকে তড়িঘড়ি দিল্লির তখতে বসালেন " সুলতান রুকনুদ্দিন ইব্রাহিম " নাম দিয়ে।
বেগম সাহেবা এই ব্যাপারে দিল্লিস্থিত আমিরদের সাথে কোন রকম শলা পরামর্শ করলেন না। এমনকি নিজের জ্যেষ্ঠপুত্র, মুলতানের সুবেদার, আরকালি খানকেও কিছু জানালেন না।
এর ফল হল এই যে সুলতান জালালউদ্দিনের বিশ্বস্ত আমিররা ও আরকালি খান মনে মনে খুব চটে গেলেন।
১২৯৬ সালের দ্বিতীয় সপ্তাহে আলাউদ্দিন দিল্লি র দিকে যাত্রা শুরু করলেন। পথে যেতে যেতে তার সৈন্যসংখ্যা আরো বৃদ্ধি পেল। দিল্লির কাছাকাছি পৌঁছাতেই সুলতান রুকনুদ্দি ইব্রাহিম তাকে সসৈন্যে বাধা দিতে এলেন।
কিন্তু এর ফল রুকনুদ্দিনের পক্ষে ভাল হলনা। রণক্ষেত্রে পৌঁছান মাত্র রুকনুদ্দিনের বেশির ভাগ সৈনিক আলাউদ্দিনের পক্ষে যোগ দিল।
রুকনুদ্দিনের অল্প কিছু সৈন্য ঝড়ের মুখে কুটোর মত উড়ে গেল।
রুকনুদ্দিন নিজের মাকে নিয়ে পালালেন মুলতানের দিকে, নিজের অগ্রজ আরকালি খাঁয়ের আশ্রয়ে।
দিল্লির অন্যান্য আমির ওমরাহেরা এসে যোগ করা দিলেন আলাউদ্দিনের পক্ষে। কেননা ঘটনার গতি প্রকৃতি দেখে তারা বুঝে গেছিলেন যে দিল্লিতে এবার আলাউদ্দিন যুগ এসে গেছে।
রুকনুদ্দিন ইব্রাহিম, আরকালি খান ও তাদের মা অবশ্য বেশিদিন পালিয়ে থাকতে পারেন নি। তাদের বন্দী করে কারাগার নিক্ষেপ করা হয়েছিল।
২১ অক্টোবর ১২৯৬ সাল। আলাউদ্দিনের তাজপোষি হল। আল্লাহর পবিত্র নাম স্মরণ করে দিল্লির শাহি তখতে বসলেন তিনি। তার নতুন নাম হল - আলাউদ্দুনয়া ওয়াদ দীন মহম্মদ শাহ উস সুলতান।
(১১)
যেদিন তাজপোষি হল, সেদিন সন্ধ্যায় মখমলের থলি ভর্তি হীরে জহরত মণি মুক্তো নিয়ে হারেমে গেলেন আলাউদ্দিন, নিজের সেই প্রথম বেগম সাহেবার সাথে দেখা করতে।
কুর্ণিশ করে বললেন, " বেগম সাহেবা, আপনি একজন সাধারণ সুবেদারের সুবেদারনি হয়ে কড়ায় যেতে চাননি। আর আমাকে বলেছিলেন দিল্লিতে থাকতে। তাই আপনার কথা শুনে আজ আমি দিল্লিতে চলে এসেছি। আর আমি বলেছিলাম যে একদিন আপনার মহল হীরে মোতি দিয়ে ভরে দেব.. "
এই বলে বেগম সাহেবার পায়ের কাছে হাতের মখমলের থলি উপুড় করে দেন আলাউদ্দিন।
"... আর হ্যাঁ, আজ থেকে আপনি আর একজন সাধারণ সুবেদারের সুবেদারনি নন। আজ থেকে আপনি মলিকা - ই - জাঁহা কেননা আজ থেকে আমি সুলতান - ই - হিন্দুস্তান। "
রাগে দুঃখে অসহায়তায় কেঁদে ফেলেন বেগম সাহেবা।
কাঁদতে কাঁদতে বলেন, " তুমি.. তুমি বেইমান। তুমি আমার আব্বা হুজুরকে হত্যা করেছ এই তখতের জন্য। উনি তো তোমারও আব্বার মত ছিলেন। জানিনা আল্লাহতালার এ কেমন মর্জি। তোমার কিসমত এখন বুলন্দিতে। কিন্তু আমি তোমাকে বদ দুয়া দিচ্ছি যে এখন শাহি তখতে বসলেও কোন দিন তুমি সিকন্দর শাহের মত হতে পারবে না। আর এই গুস্তাখির শাস্তি একদিন আল্লাহতালা তোমাকে জরুর দেবেন।
বেগম সাহেবার কথায় আলাউদ্দিন রাগ করেন না। বেগম সাহেবার চোখের জল মুছিয়ে দিতে দিতে মৃদু কণ্ঠে বলেন, " সেদিনও আপনি আমার কথায় এতবার না করে ভুল করেছিলেন। আজও আমার কথায় এতবার করছেন না। অন্যের কাছে আমি যাই হইনা কেন, যেমনই হই না কেন, আপনার কাছে কিন্তু আমি আপনার সেই শৌহর, আলি গুর্শাস্প।
আপনার সেদিনের এক ফটকার (ধমক) আমাকে সাধারণ সুবেদার থেকে সুলতান - ই - হিন্দুস্তান করে দিয়েছে। আর আপনার আজকের ফটকারও আমাকে সুলতান - ই - হিন্দুস্তান থেকে সিকন্দর শাহের বরাবর করে দেবে। "
নিকাহের এত বছর পর এই প্রথম বেগম সাহেবার সাহচর্য্যে হারেমে রাত কাটালেন আলাউদ্দিন।
(১২)
তখতে বসে আলাউদ্দিন মন দিলেন সামরিক শক্তি বৃদ্ধিতে। সমস্ত সেনানী ও সৈনিকদের বেতন বৃদ্ধি করলেন।
সাধারণ পদাতিক সৈনিকের বেতন ধার্য্য হল বাৎসরিক ১৫৬ তঙ্কা (রূপোর টাকা), এক অশ্ব সমেত অশ্বারোহীর বেতন ছিল ২৩৪ তঙ্কা আর দুই অশ্ব সমেত অশ্বারোহীর বেতন ছিল ৩১২ তঙ্কা। যুদ্ধে জয়লাভ করলে পারিতোষিক প্রদানের ব্যবস্থা করলেন।
সব সেনানী ও সৈনিকদের দেড় বছরের বেতন অগ্রিম দিলেন ও তাদের বিশেষ সামরিক শিক্ষার ব্যবস্থা করলেন।
বুদ্ধিমান আলাউদ্দিন বুঝেছিলেন যে দীর্ঘ সময় সুলতানি করতে হলে উন্নত মানের সেনাবাহিনী প্রয়োজন। আর তা রাখতে হবে নিজের অধীনে।
তার সময় রাজধানী দিল্লিতে প্রায় সাড়ে চার লাখ সৈনিক ও অশ্বারোহী সব সময় মজুদ থাকত।
উল্ল্যেখযোগ্য এই যে সৈনিকদের এতো বেতন কিন্তু এর কয়েকশ বছর পর সম্রাট আকবরও দিতেন না।
এছাড়াও শাসন ব্যবস্থার নানা ভাবে উন্নতি ঘটালেন।
ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দিন বারণীর মতে (১২৮৫ - ১৩৫৭) আলাউদ্দিন সুলতান হবার পর অন্তত এক বছর এত ভাল সময় ছিল যা দিল্লির অধিবাসীরা আগে কখনো দেখেনি।
আলাউদ্দিন নিজের নতুন রাজধানী তৈরি করলেন সিরিতে। দিল্লির একটি রাজপথ সিরি ফোর্ট রোডের আশেপাশে এই রাজধানীর ধ্বংসাবশেষ এখনও দৃষ্টিগোচর হয়।
দিল্লিতে গুছিয়ে বসে আলাউদ্দিন শুরু করলেন তার বিজয় অভিযান।
চতুর আলাউদ্দিন দেখেছিলেন যে হিন্দু রাজাদের মধ্যে কোন একতা নেই। সবাই আত্মগর্বী, অহঙ্কারী। যে যত বড় রাজা তার তত বেশি অহঙ্কার। সাধারণ হিন্দুদের মধ্যেও একতা নেই। জাত পাতের বেড়াজালে তারা আবদ্ধ।
যুদ্ধের পর যুদ্ধ হল হিন্দু রাজাদের সাথে। গুজরাট, মালওয়া, দেবগিরি, ওয়ারাঙ্গল, রণথোম্ভর, মহান চিতোড়...সবাই একে একে স্বাধীনতা বিসর্জন দিল আলাউদ্দিনের অশ্বারোহী বাহিনীর অশ্বক্ষুরের নীচে।
এ ছাড়াও চার বার মঙ্গোল আক্রমণ প্রতিহত করলেন আলাউদ্দিন। এমন শিক্ষা দিলেন মঙ্গোলদের যে তারা এর পর আর হিন্দুস্তান আক্রমণ করার সাহস পায়নি।
আলাউদ্দিনের সুলতান হবার কয়েক বছরের মধ্যেই দেখা গেল যে সম্পূর্ণ হিন্দুস্তানে না হলেও, বেশির ভাগ যায়গাতেই - দ্বারসমুদ্র থেকে দিপালপুর ও গুজরাট থেকে বঙ্গ - উড্ডীন হয়েছে ইসলামের অর্ধচন্দ্র শোভিত হরিৎ বর্ণের পরচম।
দিল্লির সুলতান আজ সর্ব অর্থেই সুলতান - ই - হিন্দুস্তান।
হিন্দুস্তানের সুলতান হবার পর তিনি উপাধি গ্রহণ করলেন - সিকন্দর - অল - সানি।
পুরানো পার্শি ভাষায় 'সিকন্দর' শব্দটির অর্থ হল 'বিজেতা'। বহু দেশে জয় করার জন্য আলেকজান্ডার কে সিকন্দর বলা হত। আর, আরবি ভাষায় 'সানি' শব্দ টির অর্থ হল প্রতিভাশালি।
পুরো শব্দটির অর্থ তাহলে দাঁড়ায় - প্রতিভাশালি বিজেতা।
ইতিহাস সাক্ষী যে তিনি এই উপাধির সম্পূর্ণ যোগ্য ছিলেন।
সব শাসকদের মতো আলাউদ্দিন ও নিজের নামাঙ্কিত বিভিন্ন মূল্যমানের তাম্র রৌপ্য ও স্বর্ণ মুদ্রা জারি করেছিলেন। এর মধ্যে সব থেকে দামি মুদ্রা ছিল ১০.৭০ গ্রাম ওজনের স্বর্ণমুদ্রা।
স্মরণীয় করে রাখার জন্য এই স্বর্ণমুদ্রায় সুলতান নিজের নাম ও উপাধিকে মুদ্রিত করে দিয়েছিলেন।
এই স্বর্ণ মুদ্রার একদিকে মুদ্রিত ছিল - অল সুলতান অল আজম আলা আলদ্দুনিয়া ওয়া আল দিন আবুল মুজফফর মুহম্মদ শাহ অল সুলতান।
ও অন্যদিকে মুদ্রিত ছিল - সিকন্দর - অল - সানি আমিন অল খিলাফা নাসির আমিরি অল মুমিনিন।
সুলতান আলাউদ্দিনের জারি করা সব মুদ্রাই ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্কের মুদ্রা জাদুঘরের সংগ্রহে আছে।
এই ভাবে বেগম সাহেবার দেওয়া সেই বদ দুয়া বা অভিশাপের প্রথম অংশ ব্যর্থ হয়েছিল। নিজের চতুরতা, সাহস, বাহুবল ও পুরুষাকারের দ্বারা আলাউদ্দিন দ্বিতীয় সিকন্দর শাহের মত হয়ে দেখিয়ে দিয়েছিলেন।
কিন্তু সময় বড় বলবান। ভিখারি হোক বা সুলতান, সময় সবার জীবন থেকেই নিজের পাওনা গণ্ডা কড়া ক্রান্তিতে বুঝে নেয়।
সুলতান আলাউদ্দিনকেও জীবন সায়াহ্নে সময়কে তার পাওনা সুদ সমেত মিটিয়ে দিতে হয়েছিল। আর এইভাবেই হয়ত বেগম সাহেবার সেই বদ দুয়ার শেষাংশ সফল হয়েছিল।
তবে সে অন্য কাহিনী।
সমাপ্ত























